বিজেপির গুজরাট মডেল vs তৃণমূলের বাংলা মডেল, দেখুন এগিয়ে কোন মডেল?

সাইফুল্লা লস্কর : ২০১৪ সালে বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করে ক্ষমতা দখলের পেছনে অন্যতম বড় ফ্যাক্টর ছিল উন্নয়নের তথাকথিত গুজরাট মডেল। বিজেপির তরফ থেকে প্রচার করা হয়েছিল গুজরাটে মোদির আমলে এমন এক উন্নয়নের মডেল তৈরি হয়েছে, যা নাকি ভারতবর্ষে তো দূরের কথা পৃথিবীর আচ্ছা আচ্ছা উন্নত দেশগুলোতেও দেখা যায় না। তবে লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বিজেপির নেতা নেত্রীদের মুখে সেই গুজরাট মডেলের বচন আর তেমন একটা শোনা যায় না। এখন তারা নিজেদের উন্নয়নের মডেল প্রচারের পরিবর্তে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অধীনে থাকা রাজ্যগুলিতে সেই সমস্ত রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরতেই বেশি ব্যস্ত। বর্তমানে ভারতের সবথেকে উন্নত রাজ্য কেরালায় বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। বিধানসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে তামিলনাড়ুর মত দক্ষিণ ভারতের আরো একটি উন্নত রাজ্য সহ এক কালে ভারতের গৌরব পশ্চিমবঙ্গেও। তাই বিজেপি প্রথাগতভাবেই তাদের নির্বাচনী কৌশল হিসাবে এই সমস্ত রাজ্য সরকার গুলিকে তাদের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বেকায়দায় ফেলে মানুষকে নিজেদের দিকে টানতে চাইছে। বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে বলেছেন, আপনারা বিজেপিকে একটা সুযোগ দেন আমরা সোনার বাংলা গড়ে দেব। তার প্রত্যুত্তরে রাজ্যের শাসক দলের নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা বিজেপিকে প্রথমে সোনার গুজরাট এবং সোনার উত্তরপ্রদেশ করার কথা বলেছেন। অন্য কোনদিন আমরা মমতার অধীনে থাকা বাংলার সঙ্গে আমরা তুলনা করবো যোগীর হাতে থাকা উত্তরপ্রদেশের উন্নয়নের। কিন্তু আজ আজ আমরা আলোচনা করব বিজেপির গড়া সোনার গুজরাট মডেল বনাম তৃণমূলের অধীনে বাংলা মডেল এর ব্যাপারে।

দুটি রাজ্যের উন্নয়নের মানচিত্র স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরতে আমরা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর দুটি রাজ্যের তুলনা করবো।

আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মোট আয়তন ৮৮,৭৫২ বর্গকিমি যেখানে বিজেপির মডেল রাজ্য গুজরাটের মোট আয়তন ১,৯৬০০৪ বর্গ কিমি।

অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান :

২০১৯-২০ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৫ শতাংশ, যেখানে গুজরাটের এই হার ছিল ১১ শতাংশ।

২০২০-২১ পশ্চিমবঙ্গে মোট এমএসএমই ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯ লক্ষ, যেখানে গুজরাটের থাকা এই ইউনিটের সংখ্যা মাত্র ৩৩ লক্ষ।

এমএসএমইতে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও অনেক এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে এই ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান পেয়েছেন ১.৩৩ কোটি মানুষ। যেখানে গুজরাটে এমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৬১ লক্ষ।

তথাকথিত শিল্পোন্নত রাজ্য গুজরাটের শ্রমিকদের জন্য বাজেট ৪ কোটি টাকা যেখানে বিজেপির ভাষায় শিল্পে অনুন্নত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এই বাজেট ৩১ কোটি টাকা।

২০২০-২১ অর্থবর্ষে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের মোট ২৮ কোটি দিন কাজ হয়েছে যেখানে গুজরাটে কাজ হয়েছে মাত্র ৩.৫ কোটি দিন।

স্বাস্থ্য পরিষেবা :

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মমতা সরকার বরাদ্দ করেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা যেখানে গুজরাট সরকার এই খাতে বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ১৮ হাজার কোটি টাকা। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এ বছর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ শতাংশ যেখানে গুজরাটি বৃদ্ধির হার মাত্র ৪ শতাংশ।

বর্তমানে নবজাতক শিশুদের মৃত্যুহার পশ্চিমবঙ্গে প্রতি ১০০০ এ ১৫.৫ যা তথাকথিত উন্নত রাজ্য গুজরাটে ২১.৮।

প্রতি ১০০০ শিশুর মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার পশ্চিমবঙ্গে এখন ২২ যা গুজরাটের ৩১.২।

পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে মোট হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৭৮৫৬৬। গুজরাটে এই সংখ্যা মাত্র ২০১৭২।

শিক্ষা ক্ষেত্র :

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের জন্য শিক্ষাখাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাজেট বরাদ্দ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু গুজরাটে এই বরাদ্দ ২৮ হাজার কোটি টাকা।

পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের ১৮ শতাংশ খরচ করে, যেখানে গুজরাটে বিজেপি সরকার শিক্ষা খাতে খরচ করে তাদের মোট ব্যয়ের ১৪ শতাংশ।

গ্রামীণ মহিলাদের সাক্ষরতার হারের দিক থেকে ও এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ মহিলাদের ৭৩ শতাংশ স্বাক্ষর পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু গুজরাটে এই হার নরেন্দ্র মোদির তিনটি কার্যকালের মেয়াদ শেষ হয়েও এখন মাত্র ৬৮ শতাংশ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মহিলাদের উপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে পুরুষদের তুলনায় ৯৪ শতাংশ যা গুজরাটে মাত্র ৯০ শতাংশ।

২০১৮-১৯ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে মোট স্কুলের সংখ্যা ৯৮০০০ যেখানে গুজরাটে আছে মাত্র ৫৫০০০ বিদ্যালয়।
আবার পশ্চিমবঙ্গে মোট সরকারি কলেজের সংখ্যা ৪৯৩ কিন্তু গুজরাটে এই সংখ্যা মাত্র ৩১৪ টি।

আইন শৃঙ্খলা :

পশ্চিমবঙ্গের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাকি ভারতের অন্য সব রাজ্যের তুলনায় চরম খারাপ। সেজন্যই প্রায় দিনই বিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন এর দাবি তোলা হয় শুধু বিজেপি নেতৃত্বই নয় রাজ্যের বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর অনেক সময় এ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে সরাসরি বা পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এখন দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় গুজরাটের ছবি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকে কতটা ভালো।

২০২০-২১ সালের বাজেটে পশ্চিমবঙ্গে পুলিশের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট ৮৩০০ কোটি টাকা যেখানে গুজরাটে পুলিশের জন্য বরাদ্দ বাজেট ৬২০০ কোটি টাকা।

প্রতি লাখে অপরাধের সংখ্যা কলকাতায় মাত্র ১৫২ যেখানে গুজরাটের সুরাট শহরে এই সংখ্যা ১৩১৭।

প্রতি লাখে মহিলাদের প্রতি অপরাধের দিক থেকেও পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা অনেক এগিয়ে রয়েছে গুজরাটের আহমেদাবাদের তুলনায়। কলকাতায় এই সংখ্যা ৩১ যেখানে আমেদাবাদে মহিলাদের বিরুদ্ধে প্রতি লাখে অপরাধ সংঘটিত হয় ৫৪ টি।

সারা ভারতের মোট দুর্নীতির মামলায় পশ্চিমবঙ্গের অবদান মাত্র ০.২ শতাংশ কিন্তু তথাকথিত আদর্শ রাজ্য গুজরাটে এই সংখ্যা ৬ শতাংশ।

উপরোক্ত তুলনা থেকে পাঠকের জন্য এটা সুস্পষ্ট হওয়া উচিত গুজরাট মডেল এবং বাংলা মডেলের প্রতিদ্বন্দিতা বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে। কেনই বা বিজেপি নেতৃত্ব আর গুজরাট মডেলের কথা প্রচার করে না আগের মত বুক ফুলিয়ে। তবে তার রাজ্যের সাধারণ মানুষ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে গুজরাট মডেলের আর সোনার বাংলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নাকি তৃণমূলের বিশ্ব বাংলার স্বপ্ন গ্রহণ করে সেটাই এখন দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *