নেলি গণহত্যা!৫ ঘণ্টায় ৫০০০ মুসলিমের হত্যাকাণ্ডের ৩৮ বছর পরেও প্রকাশিত হয়নি তদন্ত রিপোর্ট,শাস্তি পায়নি কোনো সন্ত্রাসী

হারানো স্মৃতি : ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা আনুমানিক ৭ টা নাগাদ দুই ট্রাকভর্তি পুলিশ কন্টিনজেন্ট আসামের বর্বরিতে আসে এবং সেখানকার বাঙালি মুসলিম অধিবাসীদের আশ্বস্ত করে যে, তারা আশেপাশে পাহারা দিচ্ছে এবং তাদেরকে হিন্দুত্ববাদী আসাম গণ পরিষদের সন্ত্রাসীদের আক্রমণ থেকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীর আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের আক্রমণের হুমকিতে ভীতসন্ত্রস্ত নেলি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দারা পরের দিন, ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যথারীতি কাজে চলে যান। সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে, হঠাৎ তিনদিক থেকে ছুরি, কাটারি, কুঠার, শাবল, বর্শা, গোদা বন্দুক হাতে নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী দলগুলো
গ্রামগুলিকে ঘিরে ফেলে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পুলিশ সেখান থেকে সরে গিয়ে সাহায্য করে হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া সন্ত্রাসীদের। গ্রামবাসীরা অতর্কিত সশস্ত্র আক্রমণে কপিলি নদীর দিকে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু নদীতেও পরিকল্পিতভাবে নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিল বহু হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী। প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে ছুরি, কাটারি, কুঠার, শাবল, বর্শা, গোদা বন্দুক দিয়ে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম এবং জঘন্যতম সাম্প্রদায়িক হত্যালীলা চালানো হয় মুসলিমদের মাঝে। সামনে পাওয়া কাউকেই ছাড় দেয়নি মানুষ রুপি নরপশুর দলগুলো। মায়ের কোলের শিশু থেকে শয্যাশায়ী প্রবীণ মানুষ, মহিলা থেকে যুবক সবাইকে টুকরো টুকরো করে সন্ত্রাসীদের দল। গর্ভবতী মায়েদের উদরের শিশুরাও রক্ষা পায়নি বর্বরদের আক্রমণ থেকে। সমস্ত বাড়িঘর ও ধানের গোলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া মুসলিমদের সমস্ত মসজিদ এবং মাদ্রাসা। খুব কম মানুষ যারা প্রাণে বেঁচে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে জায়গা পেয়েছিলেন তারা অবস্থা একটি উন্নত হওয়ার পর অর্থাৎ ঘটনার প্রায় ১৬ দিন পর স্বগৃহে ফিরে এসে দেখেন যে সেই ধানের গোলার আগুন তখনও জ্বলছে। হামলার দু’দিন আগে কানাঘুষো খবর পেয়ে অসহায় মুসলিমরা নেলি থানায় গিয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আবেদন করেছিলেন কিন্তু পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয়নি উল্টে সাহায্য করেছিল হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের। বেশিরভাগ লাশ গণকবর দেয় সন্ত্রাসীরা নিজে হাতেই। বহু লাশ ভাসিয়ে দেয় নদীর স্রোতে। পরবর্তীতে গণনায় দেখা যায় অন্তত ৫০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ওই সরকারি সাহায্যে পরিচালিত গণহত্যায়। ধর্ষিত হয়েছিলেন অসংখ্য মহিলা। গৃহহীন হতে হয় অসংখ্য মানুষকে। পঙ্গু হয়ে থেকে যান বহু মানুষ।

এই গণহত্যার ব্যাপারে সব থেকে বিস্ময়কর বিষয় ছিল এই গণহত্যায় সাহায্য করেছিল আসামের পুলিশ এবং তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস সরকার। তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিলেন রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। এই গণহত্যার পরবর্তী বছরে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আবার কংগ্রেস সরকার মেতে ওঠে রক্তের হোলি খেলায়। তখন জায়গাটা ছিল অমৃতসর। আক্রমণের কেন্দ্রে ছিল শিখ সম্প্রদায়। তবে এই আক্রমণের ব্যাপারে পরবর্তী সমস্ত কেন্দ্র সরকার ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয় সরকার। নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয় ভারতীয় সেনা পরিচালিত ওই মূল অভিযানের ও। কিন্তু নেলী হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কোনো সরকার ক্ষমা প্রার্থনা তো দূরের কথা দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি যেমন করেননি গুজরাট দাঙ্গার ব্যাপারে। নেলীতে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের বলি পরিবারগুলোকে পরবর্তীতে আসাম সরকার মাত্র ৫ হাজার করে টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও বেশীরভাগ পরিবার সেই অর্থ সাহায্য পাননি। হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তদন্তের জন্য গঠন করা হয় ত্রিভুবন তিওয়ারির নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই সময় ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে থাকায় হত্যাকান্ডের হোতা সন্ত্রাসী সংগঠন আসাম গণ পরিষদের আপত্তির কারণে ওই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি আসামের কোনো সরকার। দোহাই দেওয়া হয় রিপোর্টটি অত্যন্ত স্পর্শ কাতর বিষয়ে পরিপূর্ণ তাই প্রকাশ করলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট হতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই রিপোর্টে সত্যি প্রকাশ পেলে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের প্রকৃত চেহারা উন্মুক্ত হয়ে যাবে বলেই আসাম গণ পরিষদ এটা প্রকাশ করতে চায়নি। আর কংগ্রেস নির্লজ্জ ক্ষমতার লোভে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য কাউকে শাস্তি না দিয়ে রিপোর্টটি গোপন করে দেয়।

ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে ৬৮৮ টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছিল পুলিশ কিন্ত কংগ্রেস সরকার এবং আসাম গণ পরিষদের যৌথ ষড়যন্ত্রের কারণে পুলিশ ঘটনাটির সমস্ত তথ্য প্রমাণ গোপন করে দেয় ফলে দোষীদের কাউকেই সাজা পেতে হয়নি। সেই সময় অভিযোগ করা হয়েছিল আসামের নওগাঁ জেলার আলিসিংহ, খুলাপাথর, বসুন্ধরি, বুগ্দুবা বিল, বুগ্দুবা হাবি, বর্জলা, বুতুনি, ইন্দুরমারি, মাটি পর্বত, মুলাধারী, মাটি পর্বত নং ৮, সিলভেতা, বর্বুরি এবং নেলি এই ১৪ টি গ্রামে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমদের কেউই বৈধ ভারতীয় নাগরিক ছিলেন না, তাদের কারোরই নাগরিকত্বের প্রমাণ নেই। কিন্তু পরবর্তীতে শুভশ্রী কৃষ্ণান পিএসবিটি ইন্ডিয়া দ্বারা প্রযোজিত একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন। সেখানে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা দেখিয়েছেন যে তাদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি ছিল। লোমহর্ষক ঘটনাটির জন্য আসাম গণ পরিষদের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুরো মাত্রায় দায়ী ছিল তৎকালীন আসামের এবং কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার, যেমন বাবরি মসজিদের ধ্বংসে পুরোপুরি শরিক ছিল নরসিমার কংগ্রেস সরকার। বর্তমানে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুসলিম প্রেম দেখানোর চেষ্টা করা কংগ্রেসের হাত অসংখ্য নিরীহ, নিষ্পাপ, অসহায় মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত। যদিও বিজেপি তাদের থেকে আরো বৃহৎ এবং অমানবিক সাম্প্রদায়িক শক্তি কিন্তু তারাও যে খুব কম যান না মুসলিমদের রক্তে হোলি খেলায় সেটা ইতিহাসের পাতা খুললেই বোঝা যাবে। আর মানুষের স্মৃতিতে কোনো রক্তক্ষয়ী গণহত্যার অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হতে পারে কিন্তু ইতিহাস কিছুই ভুলে যায় না, কাউকেই ক্ষমা করে না। এটি খুব ভালো করে টের পাচ্ছে ১৮৮৫ সালে পথ চলা শুরু করা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীতে সারাভারতে একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করা রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যারা এখন নিজেদের কর্মফলের যাঁতাকলে পড়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *