
লন্ডনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অক্সফোর্ডে বক্তৃতার মাঝেই আর জি কর মেডিকেল কলেজে ঘটে যাওয়া স্নাতকোত্তর ডাক্তারি ছাত্রী তিলোত্তমার ধর্ষন ও খুন কাণ্ড যা সারা পৃথিবীতে ঝড় তুলেছিল সেই ঘটনার প্রতিবাদে পোস্টার তুলে ধরে তুমুল বিক্ষোভ দেখানো হয়। সিপিআইএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের ব্রিটেনের শাখা স্বীকার করে নিয়েছে যে, তাদের লোকজন বিক্ষোভে ছিল। বিক্ষোভকারীদের “মিথ্যেবাদী” ও “তিলোত্তমার খুনি” শ্লোগানে গমগম করছিল গোটা হলঘর। সুদুর লন্ডনেও এত তুমুল বিক্ষোভ দেখে তাতে বাম্পন্থীদের ভুত দেখতে পান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতি বেগতিক। বিদেশ-বিভুঁইয়ে মানসন্মানহানীর ভয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথায় বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন ‘‘ইউ আর মাই সুইট ব্রাদার। আই লভ ইউ অল। প্লিজ শান্ত হোন। আমি আপনাদের মিষ্টি দেব।’’। তার এসব কথায় কেউই কর্ণপাত না করলে তিনি বাম, অতিবামদের বন্ধু বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন “আপনাদের আমি চকোলেট দেব। আপনাদের মতাদর্শকেও চকোলেট খাওয়াব।’’, ‘‘আমি আপনাদের সকলকে খুব ভালবাসি। আপনারা আপনাদের পার্টিকে আরও মজবুত করুন। যাতে আমার সঙ্গে তাঁরা লড়তে পারে!’’ তার এসব কথায় ছিঁড়ে না ভিজলে তিনি দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে সহানুভূতি কুরোনোর চেষ্টা করে বলেন ‘‘আমাকে অপমান করছেন করুন। দেশকে অপমান করবেন না।’’।
এত সব চেষ্টার পরেও যখন তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে পারেন নি তখন তিনি রেগে বেস মেজাজ নিয়েই বলেন ‘‘আমি বছরে দু-বার করে অক্সফোর্ডে আসব। যত বার বলবেন, তত বার আসব। আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।”
অনুষ্ঠান চলাকালীন সিঙ্গুর ও টাটা গোষ্ঠীর ঘটনা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হলে হল ঘরের হাওয়া গরম হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো ঘাবড়ে গিয়েই বেশ কিছু ভুল তথ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে যা নিয়ে রীতিমতো বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
এর থেকেই বোঝা যায় যে তিনি লন্ডনের বুকেও এই তুলুল বিক্ষোভ দেখে বামপন্থীদের ভয় পেয়েছেন।

প্রতিবাদের মূল ইস্যু:
১. সামাজিক উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নে ফাঁকফোকর:
বিক্ষোভকারীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি করা “কন্যাশ্রী” বা “রূপশ্রী” প্রকল্পের সাফল্যকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁরা জানান, গত এক বছরে রাজ্যে মেয়েদের স্কুল ড্রপআউটের হার ১৯% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিশু বিবাহের ঘটনাও সর্বোচ্চ পর্যায়ে ।
২. আর জি কর মেডিকেল কলেজের তিলোত্তমার ঘটনায় দোষীদের আড়ালের অভিযোগে:
তিলোত্তমা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া, ভুক্তভোগীকে দায়ী করার মানসিকতা ও নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করা হয় ।
৩. ছাত্র গণতন্ত্রের দাবিতে দমননীতি:
এসএফআই সদস্যরা জিজ্ঞাসা করেন, কেন গত ৬ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর গাড়ির তলায় ছাত্র পিষে মেরে ফেলার চেষ্টার অভিযোগও উত্থাপন করা হয় ।
৪. কেলগ কলেজের আমন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক:
বিক্ষোভকারীরা কলেজ প্রশাসনকে জিজ্ঞাসা করেন, কীভাবে একটি “বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান” হিসাবে দাবিদার কেলগ কলেজ এমন নেতাকে মঞ্চ দিচ্ছে, যিনি কর্পোরেট স্বার্থে স্থানীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা সংগঠিত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডনে বামপন্থীদের তীব্র প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বস্তি ও চাপের ছাপ স্পষ্ট। বিদেশে তাঁর সরকারের সমালোচনা এবং রাজনৈতিক বিরোধী বামপন্থীদের সরব উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানের মূল ফোকাসে পরিণত হয়েছে। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।