
ওয়াকফ (সংশোধন) বিল, ২০২৪-এর বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও ডিএমকে-র সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা
তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সম্প্রতি সংসদে পাস হয়েছে ওয়াকফ (সংশোধন) বিল, ২০২৪। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC) এবং দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগাম (DMK) এই বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫ এই ঘোষনা করা হয়, যখন এই বিলটি ১৩ ঘণ্টার দীর্ঘ বিতর্কের পর সংসদে অনুমোদিত হয়েছে।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ দলের পরিকল্পনা প্রকাশ করে বলেছেন, “INC খুব শীঘ্রই সুপ্রিম কোর্টে ওয়াকফ (সংশোধন) বিল, ২০২৪-এর সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।” তিনি আরও জানিয়েছেন, “আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী যে ভারতের সংবিধানে নিহিত নীতি, বিধান এবং রীতিনীতির উপর মোদী সরকারের যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।” কংগ্রেস এই বিলটিকে “মুসলিম বিরোধী” এবং “অসাংবিধানিক” আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে।
কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ দলের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, “আমরা এই বিলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করব। আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার পর আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাব। এর বাইরে কোনো পথ খোলা নেই। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।”

সিনিয়র কংগ্রেস নেতা এবং আইনজ্ঞ অভিষেক মনু সিংভি সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, “যদি এই বিলটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়, তবে বিচার বিভাগ এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার সম্ভাবনা প্রবল।” তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে শাসক দল সংসদে “সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার” করে এই আইনটি পাস করিয়েছে।
রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গে এই বিলটিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে বলেছেন, “সরকার এই আইনের মাধ্যমে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।” তিনি সরকারকে দেশের শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “জাতীয় সম্প্রীতি নষ্ট করবেন না।” তাঁর দাবি, এই বিল মুসলিমদের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে সম্প্রদায়টির ক্ষতি করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এবং ডিএমকে সভাপতি এম. কে. স্ট্যালিন এই বিলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, “ডিএমকে ওয়াকফ (সংশোধন) বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করবে।” তিনি আরও জানিয়েছেন, “এই সংশোধন কেবল বিরোধিতা করার জন্য নয়, এটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত—এটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। তাই আমরা বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাস করেছি।”
এই বিতর্কিত আইনটি লোকসভায় ২৮৮ ভোটের সমর্থনে এবং ২৩২ ভোটের বিরোধিতায় পাস হয়েছে। পরে রাজ্যসভায় এটি ১২৮ ভোটে সমর্থিত এবং ৯৫ ভোটে বিরোধিতার মধ্য দিয়ে অনুমোদিত হয়। এই ফলাফল ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
কংগ্রেস ছাড়াও বামপন্থী দলগুলি, AIMIM, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ, তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, সমাজবাদী পার্টি ও আরজেডি মতো বেশ কয়েকটি বিরোধী দল এই বিল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিছু দল এই আইনটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এই আইনের পক্ষে জোর দিয়ে বলেছে যে সংশোধনটির উদ্দেশ্য ওয়াকফ বোর্ডগুলির সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ, যাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আরও উন্নত সেবা প্রদান করা যায়। বিজেপি জাতীয় সভাপতি এবং রাজ্যসভার সভানেতা জে. পি. নাড্ডা সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “কংগ্রেস তার শাসনকালে মুসলিম মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছিল।” তিনি দাবি করেছেন যে এই বিল দরিদ্র ও মুসলিম মহিলাদের অধিকার সুরক্ষিত করবে।

কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এই অবস্থানের সমর্থনে বলেছেন যে ওয়াকফ বোর্ডগুলির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা হবে। অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উদ্বেগের জবাবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে এই প্রতিনিধিত্ব সীমিত থাকবে—২২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৪ জন অমুসলিম হবেন।
কংগ্রেসের এই পদক্ষেপ বিজেপি সরকারের একাধিক বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে তাদের চলমান আইনি প্রচেষ্টার অংশ। জয়রাম রমেশ জানিয়েছেন যে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA), ২০১৯, তথ্যের অধিকার (RTI) আইন, ২০০৫-এর সংশোধন, সংশোধিত নির্বাচন পরিচালনা বিধি (২০২৪) এবং উপাসনা স্থান আইন, ১৯৯১ রক্ষার জন্য তাদের আবেদনগুলি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
এই বিল নিয়ে বিরোধী দলগুলির আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় এই বিতর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।