দিল্লির সিভিল লাইন্স এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষ প্রাচীন ‘শের জং কবরস্থান’ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কের অবসান ঘটাল আদালত। দিল্লির তিস হাজারি আদালত সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, প্রায় ৮২ বিঘা বিস্তৃত এই কবরস্থানটি মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবেই বহাল থাকবে। ফলে জমিটির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি আদালত খারিজ করে দিয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর লেফটেন্যান্ট গভর্নরের বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত এই কবরস্থান বহু বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের দাফনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সরকারি নথিতেও এটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। ‘আঞ্জুমান উকিল কওম পাঞ্জা বয়ান’ নামে একটি সংস্থা এই কবরস্থানের দেখভাল করে এবং তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা বহু ওয়াকফ সম্পত্তির মধ্যে এটি অন্যতম।
মামলার সূত্রপাত হয় কবরস্থানের জমি নিয়ে মালিকানা দাবি ঘিরে। প্রয়াত কালু মিস্ত্রি নামে এক ব্যক্তি একসময় কবরস্থানের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে তাকে মূলত প্রহরীর কাজ দেওয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ফাতেমা ও ছেলে নবাব ওই জায়গাতেই বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা ওই জমির উপর নিজেদের মালিকানা দাবি করেন।
এই পরিস্থিতিতে আঞ্জুমান কর্তৃপক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়। ২০১৮ সালে আদালত ফাতেমা ও নবাবকে ওই জমি খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কালু মিস্ত্রি কেবল দায়িত্ব পালন করার জন্য সেখানে থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়ার পর তার পরিবারের সেখানে বসবাসের কোনও আইনি অধিকার নেই।
তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে নবাব আপিল করেন। তার দাবি ছিল, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করার কারণে জমির উপর তাদের অধিকার তৈরি হয়েছে। কিন্তু আদালতে সেই দাবির পক্ষে কোনও বৈধ কাগজপত্র বা প্রমাণ হাজির করতে পারেননি তিনি।
সব পক্ষের বক্তব্য শুনে তিস হাজারি আদালত আগের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। বিচারকের মন্তব্য, জমিটির মালিকানা নিয়ে ব্যক্তিগত দাবি প্রতিষ্ঠার মতো কোনও প্রমাণ নবাব দেখাতে পারেননি।
আঞ্জুমানের পক্ষে থাকা আইনজীবী ওয়াজিহ শফিক আদালতে জানান, বহু বছর আগে সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের জমি দান করে এই কবরস্থান গড়ে তোলেন। পরে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। সেখানে একজন প্রহরী নিয়োগ করা হয়েছিল শুধু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। রায় ঘোষণার পর আইনজীবী বলেন, আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে বিপক্ষ পক্ষ তাদের দাবির পক্ষে কোনও নথি দেখাতে পারেনি। তাই আদালতের সিদ্ধান্ত আঞ্জুমানের পক্ষেই গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় সম্পত্তি নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই রায়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। স্থানীয় সমাজের নেতাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ঐতিহাসিক কবরস্থানটির মর্যাদা অটুট থাকবে এবং ভবিষ্যতে একে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানানোর চেষ্টা আর সফল হবে না। বর্তমানে আগের মতোই আঞ্জুমান কর্তৃপক্ষ কবরস্থানটির দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে বলে জানা গিয়েছে।

