
নাসার কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গল গ্রহে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছে, যা লাল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। গেল ক্রেটার অঞ্চলের ‘কাম্বারল্যান্ড’ নামক পাথরের নমুনায় শনাক্ত হয়েছে ডেকেন, আনডেকেন ও ডোডেকেন নামের দীর্ঘ শৃঙ্খলযুক্ত জৈব যৌগ। এগুলোর প্রতিটিতে যথাক্রমে ১০, ১১ ও ১২টি কার্বন পরমাণু রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলো ফ্যাটি অ্যাসিডের টুকরো হতে পারে—যা পৃথিবীতে জীবকোষের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্যাম্পল অ্যানালাইসিস অ্যাট মার্স (এসএএম) ল্যাবের পরীক্ষায় এই যৌগগুলো শনাক্ত হয়েছে। গবেষণাপত্রটি ২৪ মার্চ ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয়। ফ্রান্সের গবেষক ক্যারোলিন ফ্রেইসিনেটের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিকদের দলটি ধারণা করছে, মঙ্গলে প্রাক-জৈব রসায়ন (প্রিবায়োটিক কেমিস্ট্রি) আগের ধারণার চেয়েও উন্নত স্তরে পৌঁছেছিল। যদিও এসব অণুর উৎস প্রাকৃতিক নাকি জৈবিক, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের মে মাসে কিউরিওসিটি রোভার ইয়েলোনাইফ বে নামক প্রাচীন হ্রদের তলানিতে কাম্বারল্যান্ড পাথরটি ড্রিল করে। এই নমুনায় এর আগে মিলেছিল কাদামাটি, সালফার, নাইট্রেট ও মিথেন—যা প্রাণের জন্য অনুকূল পরিবেশের সাক্ষ্য দেয়। নতুন গবেষণায় অ্যামিনো অ্যাসিড খুঁজতে গিয়ে আকস্মিকভাবে দীর্ঘ শৃঙ্খলের হাইড্রোকার্বনগুলো ধরা পড়ে।

ফ্যাটি অ্যাসিড সাধারণত জীবদেহে কোষপ্রাচীর গঠনে সাহায্য করে, তবে হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায়ও এগুলো সৃষ্টি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১১-১৩টি কার্বনবিশিষ্ট দীর্ঘ শৃঙ্খলযুক্ত যৌগগুলো প্রাণের সংকেত দিতে পারে, কারণ অজৈবিকভাবে সাধারণত ছোট শৃঙ্খল তৈরি হয়। তবে নমুনায় উপস্থিতির মাত্রা কম ও যন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গ্লাভিনের মতে, “মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করলেই কেবল প্রাণের রহস্য ভেদ করা সম্ভব।” ২০২০-এর দশকের মধ্যে মার্স স্যাম্পল রিটার্ন মিশনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে গেল ক্রেটারে দীর্ঘ সময় ধরে তরল পানি ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। কাদাপাথরে জৈব পদার্থ সংরক্ষণের জন্য এটিই ছিল আদর্শ পরিবেশ। ফ্রেইসিনেটের কথায়, “এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, মঙ্গলে যদি কখনও প্রাণ থেকে থাকে, তাহলে তার রাসায়নিক স্বাক্ষর আজও টিকে থাকতে পারে।”
বিজ্ঞানীরা এখন অপেক্ষায় আছেন মঙ্গলের মাটি সরাসরি পরীক্ষার জন্য। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই লাল গ্রহের রহস্যময় জীবনঘনিষ্ঠ এই ধাঁধার সমাধান মিলবে!
তথ্যসূত্র: নাসা, পিএনএএস, ও সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্র।
ক্রেডিট: নাসা