বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের পুনিশোল গ্রামে নতুন ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই অস্বস্তি ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গ্রামের বহু মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অভিযোগ উঠছে, অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে বহু সাধারণ ভোটারের নামও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। পুনিশোল অঞ্চলে মোট ২৯টি বুথ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি বুথই এই গ্রামে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ভোটারের মধ্যে অন্তত ৮ হাজারের বেশি মানুষের নাম ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই তালিকায় নাম উঠেছে অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক জলিলুর রহমানেরও। পুনিশোল গ্রামেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বহু বছর তিনি স্থানীয় গ্রন্থাগারে কাজ করার পর প্রায় ছয় বছর আগে অবসর নেন। এলাকায় সামাজিক কাজকর্মের জন্য তিনি পরিচিত মুখ। বর্তমানে তিনি স্নায়ুর রোগে ভুগছেন এবং শয্যাশায়ী। তবুও দু’মাস আগে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর শুনানির জন্য তাকে ওন্দা ব্লকে ডাকা হয়। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি পাসপোর্ট, মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি, অবসর সংক্রান্ত কাগজপত্র ও ভোটার পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য জমা দেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেও তাঁর নাম ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় থেকে যায়।
শুধু জলিলুর রহমান নন, তার মেয়ে রাবেয়া বিবি, যিনি আইসিডিএস কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বুথের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গে কাজ করেন, তার নামও একই তালিকায় রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এলাকাজুড়ে। এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই অত্যন্ত দরিদ্র। অনেকেই হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ পুরোনো লোহা, টিন বা কাগজ সংগ্রহ করে বিক্রি করেন, আবার কেউ কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে গিয়ে গাছ কাটা, পাথর ভাঙা বা নির্মাণের মতো কঠিন শ্রমের কাজ করেন। দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামের মধ্যেই দিন কাটে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকায় নাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। উপরডাঙা এলাকার বাসিন্দা আবদুল সাবুর মোল্লা বলেন, “পঞ্চাশের দশক থেকে ভোট দিচ্ছি। এত বছর কোনও সমস্যা হয়নি। এখন হঠাৎ বলা হচ্ছে আমার নাম সন্দেহের তালিকায়।”
গ্রামের জিড়রি পাড়ার কয়েকজন গৃহবধূ, জাহানারা খান, বেগমভানু খান, মানোয়ারা বিবি, আমেনা বিবি ও জালেখা খানের নামও একইভাবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা জানান, বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, কিন্তু এবার তাদের নাম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কেশবপুর এলাকার একটি বুথে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানে ১০৪৫ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭৫০ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এলাকার মানুষ অভিযোগ করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই বহু মানুষের নাম নিয়ে এই বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে শাসক দল ও বিরোধী শিবিরের একাংশ। অন্যদিকে, এই পরিস্থিতিতে বাম দল সিপিআই(এম) বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ওন্দা ব্লক অফিসে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।


