আগে বুলডোজার চালিয়ে বাড়িঘর ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকেও নাম বাদ পড়ল বহু মানুষের। এমন অভিযোগ উঠেছে অসমে। ধুবড়ি জেলার চিরাকুঠা গ্রামের বাসিন্দা বোদিয়াত জামালের পরিবার সেই ঘটনারই এক উদাহরণ।
সাত মাস আগে পর্যন্ত চিরাকুঠা গ্রামেই পাকা বাড়ি ছিল জামালদের। কিন্তু গত বছর জুলাই মাসে একটি পাওয়ার প্রজেক্টের নাম করে অসম সরকার প্রায় ১,৪০০টি বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করে। সেই উচ্ছেদের শিকার হন জামালের পরিবারও। বাড়ি হারিয়ে গত সাত মাস ধরে পরিবার নিয়ে ত্রিপল টাঙিয়ে কোনও রকমে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। পেশায় রাজমিস্ত্রি জামাল বলছেন, শুধু বাড়িঘর বা জমি হারানো নয়, এখন যেন নাগরিক পরিচয়টাও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গত সপ্তাহে তিনি জানতে পারেন, অসমে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সংশোধনের (এসআর) পরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের মোট নয়জন সদস্যের নাম বাদ পড়েছে। অথচ গত ২৪ বছর ধরে তারা এখানেই ভোট দিয়ে আসছেন। হতাশ জামাল বলেন, “এত বছর ভোট দিয়েছি, কিন্তু এবার আর ভোট দিতে পারব না।”
ভোটার কার্ড না থাকলে কাজ করাও যে কতটা কঠিন হয়ে পড়বে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। রাজমিস্ত্রির কাজের সূত্রে বিভিন্ন জেলায় যেতে হয় তাকে। জামালের কথায়, ভোটার পরিচয়পত্র ছাড়া এভাবে কাজের জন্য জেলা থেকে জেলায় যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি ডিব্রুগড় জেলায় কাজ করতেন, কিন্তু গত মাসে খবর পান তাঁর নামের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হয়েছে। এরপরই তিনি ফিরে আসেন। তার আশঙ্কা, ভোটার কার্ড ফিরে না পেলে ভবিষ্যতে কাজ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
জামাল একা নন। চিরাকুঠা গ্রামের অন্তত ২২১ জন বাঙালি মুসলিম ভোটারের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে। ধুবড়ি ও উরিয়ামঘাট এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৫,৭০০ জনের নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে একটি সংবাদ পোর্টালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ধুবড়িতে গত জুলাই মাসে যে চারটি ভোটকেন্দ্রের এলাকা থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানে প্রায় ৭৫৬ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিলাসিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের দুই বুথ লেভেল অফিসারের বক্তব্য, উচ্ছেদের ফলে অনেকের বাসস্থানের ঠিকানা বদলে যাওয়ায় ৭০০ জনেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দিতে হয়েছে। আবার উরিয়ামঘাট এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া ১৯টি গ্রামের পাঁচটি ভোটকেন্দ্র থেকে মোট ৪,১৪৫ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে। এক বুথ লেভেল অফিসারের দাবি, তাঁর ওয়ার্ডেই উচ্ছেদের কারণে ২০০ জনের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
তবে জামালের প্রশ্ন, তিনি তো গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাননি। তবু কেন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নামে ফর্ম-৭ জমা দিয়ে আপত্তি জানানো হল? এই বিষয়ে তিনি স্থানীয় বিএলও-র কাছে জানতে চাইলেও স্পষ্ট কোনও উত্তর পাননি। বরং তাঁকে বীরসিংহ জারুয়া নির্বাচনী এলাকার ভোটার হিসেবে নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়। তিনি আবেদনও করেছেন, কিন্তু তা এখনও গৃহীত হয়নি।
এদিকে গত ২৫ জানুয়ারি রাজ্যের পাঁচটি বিরোধী দল অসমের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে অভিযোগ করেছিল, উচ্ছেদের ফলে বাস্তুচ্যুত বহু প্রকৃত ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় তোলা হচ্ছে না। তাদের অনলাইনে বা অফলাইনে আবেদন করার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করা হয়।
গত পাঁচ বছরে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারের আমলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই বাঙালি মুসলিম। গত আগস্ট মাসে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হবে।
চিরাকুঠা গ্রামের আরেক বাসিন্দা হাবেজ আলির ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। গত জুলাইয়ে তার বাড়িও বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর তিনি স্থানীয় বিএলও-র কাছে খোঁজ নিতে গেলে ২১ জানুয়ারি একটি নোটিশ পান। সেখানে জানানো হয়, তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ফর্ম-৭ দাখিল করা হয়েছে এবং তাকে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছে। পরে জানা যায়, যে ব্যক্তির নামে ফর্ম-৭ জমা পড়েছে, তিনি নিজেই দাবি করেছেন ওই স্বাক্ষর তাঁর নয়। তবু শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে হাবেজ আলির নামও বাদ পড়ে।
এই ঘটনাগুলি নিয়ে এলাকায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেরই প্রশ্ন, উচ্ছেদের পর এবার ভোটাধিকারও হারালে ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে।

