ইরানে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত ঘিরে দ্রুত জয়ের যে আশা করেছিল মার্কিন প্রশাসন, তা এখন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিদেশে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত কম খরচে এবং কম প্রাণহানিতে দ্রুত ফল পাওয়ার কৌশল নেন। ভেনেজুয়েলা বা ইয়েমেনের মতো জায়গায় এই ধরনের অভিযান কিছুটা সফল হলেও ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। তবে অভিযান শুরুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। কুয়েতের মরুভূমিতে একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর সামনে আসে। এতে ওয়াশিংটনের দ্রুত ও নির্ভুল সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই সংঘাতে ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানের উড়ান এবং পারস্য উপসাগরে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টাপাল্টি হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধটি একতরফা নয়। বরং পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-কে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা ছিল, এতে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ছবিই সামনে এসেছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। সেই কাউন্সিলের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং বিচার বিভাগের প্রধান মোহসেনি এজেই। তারা দ্রুত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি সরকারের সমালোচক অনেক সাধারণ ইরানিও এখন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে একসঙ্গে দাঁড়াচ্ছেন বলে খবর।
এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান শুরু করায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের কিছু সদস্য মিলে একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। সিনেটর টিম কেইন-এর নেতৃত্বে একটি দ্বিদলীয় জোট ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অভিযানের গতি বাড়ানোর কথা বললেও সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করছেন। বিশ্লেষক জন হফম্যানের মতে, ইরানের পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার মতো নয়। এখানে দ্রুত জয়ের আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
তার মতে, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পুরো পশ্চিম এশিয়া জুড়ে অস্থিরতা বাড়তে পারে। এমনকি দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে।


