পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আপত্তি জানিয়েছে সিপিআই(এম)। দলটির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখে দাবি করেছেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশনের সাম্প্রতিক মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না এবং তা বিভ্রান্তিকর।
সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি দল পশ্চিমবঙ্গে আসে। মূলত আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতেই এই সফর ছিল। সফরের শেষে গত মঙ্গলবার কমিশনের পক্ষ থেকে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, রাজ্যের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নাকি এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেছে। এই মন্তব্য নিয়েই আপত্তি জানিয়েছে সিপিআই(এম)।
মহম্মদ সেলিম তার চিঠিতে বলেছেন, কোন কোন দল এই প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলেছে এবং কারা এর বিরোধিতা করেছে—সেই তথ্য প্রকাশ না করে “অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সমর্থন করেছে” বলা ঠিক নয়। তার মতে, এতে সত্য বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, সিপিআই(এম) শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদের সামনেও তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেছে। সেই অবস্থান উপেক্ষা করে এমন মন্তব্য করা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছে দলটি।
চিঠিতে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে সিপিআই(এম)-এর তিনটি প্রধান আপত্তির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, তথাকথিত ‘যুক্তিগত অসঙ্গতি’ দেখিয়ে অনেক ভোটারকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। দলের দাবি, এই অস্বচ্ছ পদ্ধতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাদের ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সিপিআই(এম)-এর মতে, ভোটার তালিকার নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের নজরদারি প্রয়োজন হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে যে প্রশাসনের ভূমিকা যথাযথ ছিল না। দলের অভিযোগ, রাজ্যের কিছু সরকারি আধিকারিক নিরপেক্ষভাবে কাজ না করায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে এবং বিচার বিভাগকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
তৃতীয়ত, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। সিপিআই(এম) দাবি করেছে, ধর্ম, জাতি, সামাজিক পরিচয় বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কোনও নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা চলবে না। যদি ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক বা আদর্শগত উদ্দেশ্য কাজ করে, তবে তা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের পরিপন্থী হবে।
সিপিআই(এম)-এর অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ সমস্যায় পড়ছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তফসিলি জাতি, মতুয়া ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিবাহের পর মহিলাদের পদবি পরিবর্তন হওয়াকেও কেন্দ্র করে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
চিঠির শেষে মহম্মদ সেলিম নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করে স্বচ্ছ ও ন্যায্য পদ্ধতিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের ব্যবস্থা করতে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন থাকার আহ্বানও জানিয়েছে সিপিআই(এম)।


