Friday, April 4, 2025
28 C
Kolkata

গো-রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক হিংসা, গণপ্রহার : সংখ্যালঘু থেকে হিন্দু, কেউই রেহাই পাচ্ছে না !

ভারতে গত কয়েক বছরে গো-রক্ষার নামে গণপিটুনির ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে। এই ধরনের স্বঘোষিত গো-রক্ষক দলগুলো প্রায়শই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের, বিশেষ করে মুসলিমদের, গরু পাচার বা গরুর ক্ষতি করার অভিযোগ তুলে তাদের বিরূদ্ধে হিংসাত্মক আচরণ শুরু করে। তবে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায় যে এই হিংসার শিকার শুধু সংখ্যালঘুরাই নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও হতে পারেন। নিচে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার বিবরণ দেওয়া হলো, যা এই সমস্যার গভীরতা তুলে ধরে।

গত ১৮ মার্চ উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যায়। অতি-ডানপন্থী সংগঠন বজরং দলের সদস্যরা এবং গো-রক্ষকবাহিনী দুজন মুসলিম ব্যক্তির উপর হামলা চালায়। তাদের বিরুদ্ধে গরু পাচারের অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার একটি ভিডিও সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের মুখ ঢেকে তাদের উপর নির্মমভাবে প্রহার করা হচ্ছে। আক্রমণকারীরা তাদের জোর করে একটি স্লোগান বলতে বাধ্য করে, যার অর্থ দাঁড়ায় “গরু আমাদের মা, গো-রক্ষক আমাদের বাবা”। ভিডিওতে শোনা যায়, যিনি এই দৃশ্য ধারণ করছিলেন তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “এদের মতো মানুষের সঙ্গে কীভাবে সাম্প্রদায়িক ভাইচারা গড়ে তোলা যায়?” এই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে হরিয়ানার পালওয়াল জেলায় আরেকটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে। এবার গো-রক্ষকবাহিনী হিন্দু সম্প্রদায়ের দুজন ব্যক্তির উপর আক্রমণ করে। ভুক্তভোগী বলকিশন, একজন ট্রাক চালক, এবং সন্দীপ, একজন কন্ডাক্টর, রাজস্থান থেকে উত্তরপ্রদেশের লখনউতে গবাদি পশু পরিবহন করছিলেন। পথ ভুলে যাওয়ায় তারা স্থানীয় পুলিশের কাছে সাহায্য চান। বেঁচে থাকা বলকিশন জানান, রণবীর সিং নামে একজন পুলিশ কর্মী তাদের ট্রাক খুলে গরু ও কাগজপত্র পরীক্ষা করেন। এরপর পুলিশ তাদের তিনজন অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়। এই ব্যক্তিরা লাঠি, তলোয়ার এবং হাতুড়ি দিয়ে বলকিশন ও সন্দীপকে নৃশংসভাবে আক্রমণ করে। আঘাতে তাদের শরীরে একাধিক হাড় ভাঙে এবং ছুরির ধারে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। পরে আক্রমণকারীরা তাদের মৃত ভেবে একটি গভীর খালে ফেলে দিয়ে চলে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, সন্দীপ এই নির্মম আঘাতে মারা যান, তবে বলকিশন ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে যান।

এই দুটি ঘটনা ভারতে গো-রক্ষকদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর ভয়ানক পরিণতির নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে। গো রক্ষার নামে এই ধরনের হিংসা কেবল গুরুতর আঘাতই নয়, প্রাণহানির কারণও হয়ে উঠেছে। পালওয়ালের ঘটনায় পুলিশের জড়িত থাকার অভিযোগ আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা সমাজে ভয়, অসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়িয়ে তুলছে। এই ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট যে, গো-রক্ষার নামে চলা এই স্বেচ্ছাচারী বিচার দেশের শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য ক্রমশ বিপদের কাঁটা হয়ে উঠছে।

Hot this week

বাতিল হলো ২৬ হাজার চাকরি, দুর্নীতির চাপে পড়ল এসএসসি নিয়োগ

২০১৬ সালের এসএসসিতে নিয়োগের পুরো প্যানেল বাতিল করল সুপ্রিম...

মাঝ রাতে লোকসভায় পাশ হল বিতর্কীত ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল: মুসলিম অধিকারের উপর আঘাত

সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল সম্প্রতি অনুমোদিত হয়েছে।...

Topics

বাতিল হলো ২৬ হাজার চাকরি, দুর্নীতির চাপে পড়ল এসএসসি নিয়োগ

২০১৬ সালের এসএসসিতে নিয়োগের পুরো প্যানেল বাতিল করল সুপ্রিম...

মাঝ রাতে লোকসভায় পাশ হল বিতর্কীত ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল: মুসলিম অধিকারের উপর আঘাত

সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল সম্প্রতি অনুমোদিত হয়েছে।...

পাতৌদি ট্রফি অবসান ?শোকার্ত শর্মিলা ঠাকুর

১৯৬৮ সালে ভারতের সিনেমা জগতের প্রিয় অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর...

Related Articles

Popular Categories