দিল্লি থেকে ফিরে এসে দিলীপ ঘোষ যেন রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন ঝড় তুলেছেন। প্রাক্তন বিজেপি রাজ্য সভাপতি হিসেবে তিনি যে দলকে গড়ে তুলেছেন, সেই দলেরই বিরুদ্ধে তাঁর কথায় এখন অস্বস্তির সুর। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “যে পার্টি দাঁড় করিয়েছে, সে কেন দল ছাড়বে?” তবুও তাঁর মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা আর দলের নেতাদের সমালোচনা শুনে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এ কি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল, নাকি বিজেপির অন্দরে ভাঙনের শুরু?
দিলীপ ঘোষের সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটা জিনিস স্পষ্ট—তিনি দলের ভেতরে কিছু নেতার আচরণে মোটেই খুশি নন। তিনি বলেছেন, “পার্টির মিটিংয়ে আমায় চেয়ার দেওয়া হত না। আমি তো কাজ করেছি। দল ছেড়ে তো চলে যাইনি। একজন-দুজন আমায় দলছাড়া করতে চেয়েছিল। তারা চেষ্টা করেছিল।” এই কথায় পরোক্ষভাবে তিনি শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতাদের দিকে আঙুল তুলেছেন, যাঁরা অন্য দল থেকে এসে বিজেপিতে প্রভাব বাড়াচ্ছেন। আর এই প্রভাবের চাপে দিলীপের মতো পুরোনো যোদ্ধারা কি কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন?
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করতে গিয়ে দিলীপ ঘোষ যেন আরও বড় বোমা ফাটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অন্তত দুর্নীতির কোনও অভিযোগ নেই।” এমনকী তিনি আরও যোগ করেছেন, “প্রশংসা এই কারণে করেছি যে যাঁরা তাকে নিয়ে এত বড়বড় কথা বলছে, তাঁদের নামে কেস আছে। যাঁকে নিয়ে এত চর্চা, তার নামে কেস নেই কেন? আর যার নামে কেস নেই, চোর ডাকাত বলে কেউ প্রমাণ করেনি, তার সঙ্গে যদি বসি, আমি খারাপ হয়ে গেলাম?” এই কথায় তিনি বিজেপির সেই নেতাদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যাঁরা মমতার বিরুদ্ধে দিনরাত চিৎকার করলেও নিজেদের দুর্নীতির দাগ মুছতে পারেননি।
দিঘায় মমতার পাশে বসে হাসিমুখে কথা বলার ঘটনাও কম চর্চার বিষয় নয়। এই ঘটনায় বিজেপির অন্দরে অস্বস্তি ছড়িয়েছে কি না, জানতে চাইলে দিলীপ বলেছেন, “কর্মীরা নয়, কিছু লোক অস্বস্তিতে পড়েছিল। সমস্যা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় এত গুরুত্ব দিয়েছে কেন? এই জন্যই দলের অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছিল।” এই কথা থেকে বোঝা যায়, বিজেপির একাংশ দিলীপের মমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখে হিংসায় জ্বলছে। আর এই হিংসা কি দলের ভেতরে আরও বড় ফাটল ধরাতে চলেছে?
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো শুরু হয়েছে। দিলীপ ঘোষের মতো একজন প্রভাবশালী নেতা যদি দলের প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তাহলে বিজেপির ভবিষ্যৎ কতটা শক্তিশালী? অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি দিলীপের প্রশংসা কি তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে? রাজনীতিতে কেউ চিরকালের বন্ধু বা শত্রু নয়—এই সত্যি কি দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে আরও একবার প্রমাণিত হল?
বিজেপির অন্দরে যে সব ঠিকঠাক নেই, তা দিলীপের কথায় স্পষ্ট। দলের পুরোনো কর্মীদের কণ্ঠস্বর যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ছে নতুন নেতাদের আগ্রাসনে। আর এই অসন্তোষ যদি বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তৃণমূলের জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিলীপ ঘোষের মতো একজন যোদ্ধাকে দলে টানার চেষ্টা করবেন? নাকি দিলীপের এই বক্তব্য কেবল একটি ক্ষণিকের আবেগ?
দিলীপ ঘোষ অবশ্য বলেছেন, তিনি দল ছাড়ছেন না। কিন্তু রাজনীতিতে কথার চেয়ে কাজ বেশি কথা বলে। আগামী দিনে তাঁর পদক্ষেপ কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একটা কথা ঠিক—এই ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মোড় আনতে চলেছে। বিজেপির গড় কি ভেঙে পড়বে, আর তৃণমূল কি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ের হাতে। তবে এই মুহূর্তে একটাই কথা বলা যায়—দিলীপ ঘোষের বক্তব্যে দুই দলেরই ঘুম উড়েছে। আপনি কী মনে করেন, এই ঘটনা কোন দিকে মোড় নেবে?


