দেশ জুড়ে ভোটের আবহ তৈরি হলেই নানা ধরনের বিজ্ঞাপন ও প্রচার সামনে আসে। সাম্প্রতিক সময়েও ‘বিকশিত ভারত’ শিরোনামে বিভিন্ন প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীকে সামনে রেখে উন্নয়নের ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। সেখানে বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানের উজ্জ্বল চিত্র দেখানো হচ্ছে। বার্তা দেওয়া হচ্ছে, দেশে নাকি নতুন নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং যুবসমাজ ভালো চাকরি পাচ্ছে। তবে সরকারি বিভিন্ন তথ্য ও সমীক্ষা এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিল খুঁজে পাচ্ছে না।
কর্মসংস্থান নিয়ে গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করেছে। প্রচারে বলা হয়েছে, এসব উদ্যোগের ফলে অনেক নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বাস্তবে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি খুব দ্রুত হচ্ছে না। কেন্দ্রের শ্রম মন্ত্রক ও জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন চাকরির সংখ্যা বাড়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই কমার ইঙ্গিত মিলছে।
শ্রম মন্ত্রকের ইএসআই সংক্রান্ত রিপোর্টে দেখা গেছে, ২৫ বছরের নিচে তরুণ কর্মীদের নতুন নিয়োগ গত বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যেখানে প্রায় ২২ লক্ষের বেশি তরুণ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, এ বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২০ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ নতুন নিয়োগের গতি আগের তুলনায় কমেছে। যদিও একই সময়ে বহু নতুন সংস্থা ইএসআই ব্যবস্থার আওতায় এসেছে, তবুও কর্মী নিয়োগের হার তেমন বাড়েনি।
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতেও কর্মীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এই সংস্থাগুলিতে প্রায় ১৭ লক্ষের বেশি কর্মী কাজ করতেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ১৪ লক্ষের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত এক দশকে কয়েক লক্ষ কর্মী কমেছে। পাশাপাশি স্থায়ী চাকরির হারও অনেকটাই কমেছে। এখন আগের তুলনায় চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ছোট ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক ছবি সামনে এসেছে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক লক্ষ শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের শিল্প বন্ধ হওয়ার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারি হিসাব বলছে, গত পাঁচ বছরে রাজ্যে কয়েক হাজার ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এর জেরে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নিয়োগের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে নির্দিষ্ট শূন্যপদের ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থা থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমেছে। সংসদে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিয়োগ অনেকটাই সংস্থার ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে। ফলে কতজন কর্মী নেওয়া হবে, তার নির্দিষ্ট হিসাব সবসময় দেওয়া হয় না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনার তথ্যেও ভিন্ন একটি ছবি ধরা পড়েছে। অর্থ মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে কয়েক কোটি জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও তার একটি বড় অংশ এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়। বহু অ্যাকাউন্টে কোনও লেনদেন হয় না, আবার অনেকগুলিতে কোনও অর্থ জমাও নেই। বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই প্রচারের চেয়ে আলাদা। ফলে এই বিষয়টি এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


