
নিউ টাউনের ফুটবল মাঠে সোমবার সকালে উপচে পড়ল মানুষের ভিড়। আয়োজকেরা ভেবেছিলেন, বড়জোর তিনশোর মতো মহিলা ইদের নমাজে যোগ দেবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট শামিয়ানার নিচে জায়গা কম পড়ে গেল—প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি নারী সেখানে জড়ো হলেন। পুরুষদের জন্যও অতিরিক্ত শতরঞ্চির ব্যবস্থা করতে হলো।
ইঞ্জিনিয়ার শেখ জেল্লার রহমান ও শিক্ষিকা ইয়াসমিন রহমানের কন্যা নওরিন রহমান, যিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং বর্তমানে মুম্বইয়ে এমবিএ পড়ছেন, ইদের নমাজে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখান। ইয়াসমিন জানালেন, “প্রতিদিন নিয়মিত নমাজ পড়তে না পারলেও ইদের দিনে মেয়ের উৎসাহ থাকে চোখে পড়ার মতো।” নওরিনের দাদা, যিনি আইসিএমআরে গবেষক, এবং তার বৌদি, পেশায় রেডিয়োলজিস্ট, প্রাজিনা প্রধান—তাঁরাও এই আনন্দঘন পরিবেশের অংশ হলেন। এ ছাড়া, সল্টলেকের হোমিওপ্যাথি কলেজ ও স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার বেশ কয়েকজন নাগরিকও ইদ-নমাজে যোগ দিলেন।
নমাজের পর হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে স্থানীয় বাসিন্দারা একসঙ্গে অতিথিদের মধ্যে সিমুই, শরবত, খাস্তা কচুরি ও মিষ্টি বিতরণ করেন। এই আয়োজনে দেখা গেল সমীর গুপ্ত, বন্দনা চক্রবর্তী, আব্দুল গফফার, হুমায়ুন সিরাজসহ তেলুগুভাষী কর্পোরেট কর্মকর্তা আর এস থানিঠিকে। নিউ টাউন কলকাতা উন্নয়ন পর্ষদের সহায়তায় নিউ টাউনের সেকুলার ফ্রন্ট ও সিটিজেন্স ওয়েলফেয়ার ফ্রেটারনিটি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।
ইদ মানেই অনেকের কাছে ছুটির আমেজ—সকালবেলার নমাজ ও সামাজিকতার পর খাওয়াদাওয়া সেরে নির্ভেজাল বিশ্রাম। তবে কিছুজনের জন্য দিনটি ব্যস্ততায় কাটে। বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, যিনি পেশায় স্কুলপাঠ্য বইয়ের প্রকাশক, তাঁকে যেতে হয়েছিল মোমিনপুরের হুসেন শাহ পার্কে। সেখানে নমাজের আগে দেওয়া তাঁর খুতবা বা ভাষণ শোনার জন্য বন্ধুরা তাঁকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন। এ বছর তাঁর বক্তব্যে উঠে এল দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রমজানের আত্মসংযমের গুরুত্ব। তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং দেশের সংবিধানের বৈচিত্র্য ও ঐক্যের আদর্শকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।
ইদের দিন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ে। একদিকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ময়দান, সিনেমা হল ও রেস্তোরাঁয় উপচে পড়া ভিড়, অন্যদিকে রমজানের সময়ে জমজমাট কিছু এলাকা হয়ে পড়ে ফাঁকা। জাকারিয়া স্ট্রিটে এক মাস ধরে রেশমি পরোটা ও হালুয়া বিক্রি করা আগরার শাহদুল্লাহ বিকেলেই নিজের শহরে ফেরার ট্রেন ধরেন। লখনউ থেকে আসা নিহারি ও কুলচার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আরবাজ নাখোদা মসজিদের ইদ-নমাজের পর প্রায় সারাদিন ঘুমিয়েই কাটান, দু’দিন পর তাঁর লখনউ ফিরে যাওয়ার কথা।
এ বছর স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বিশেষভাবে নতুন নোট বিতরণের ঘোষণা করেছিল, যাতে ছোটদের ‘ইদি’ উপহার দেওয়ার আনন্দ আরও বেড়ে যায়। পাশাপাশি, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ‘সহজিয়া’ পত্রিকার বিশেষ ইদসংখ্যা প্রকাশ করতে পেরেছেন নাফিস আনোয়ার, শেখ সাহেবুল হক, সফি মল্লিক ও রাজু দেবনাথের মতো একদল বন্ধু। তাঁরা আগামী বছর আরও উন্নত সংস্করণ প্রকাশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।