উৎসবের আবহে বিষাদের ছায়া। চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে একাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রায় কুড়িটি প্রাণহানির খবর সামনে আসার পরেই পুজো উদ্যোক্তাদের ভূমিকা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং পুলিশের প্রস্তুতি নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। একই সঙ্গে পুজো কমিটির কর্তৃত্ব বদলকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। অভিযোগের নিশানায় বিজেপি নেতাদের পাশাপাশি পুজো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নতুন কমিটিও।
গত কয়েক বছরে কলকাতার দুর্গাপুজোর মানচিত্রে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল চোরবাগান সর্বজনীন। পুজোর উত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পুজোর দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয় তাঁকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি মেনে নতুন কমিটির হাতে পুজোর কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
নতুন কমিটিতে উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষকে মুখ্য উপদেষ্টা, জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝাকে চেয়ারম্যান এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারীকে মুখ্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই রদবদলকে কেন্দ্র করেই পুজোর পরিচালনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বাঁধে।
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অবস্থান ধরে রাখতে জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। ৪ মে-র পর ক্লাবঘরের দেওয়ালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি আঁকানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও পুজোর কর্তৃত্ব ফিরে পাননি তিনি। জায়গা দখল করে ক্লাবঘর তৈরির অভিযোগে কলকাতা পুরসভা বুলডোজ়ার চালিয়ে সেটি ভেঙে দেয় বলে জানা গিয়েছে।
এর পর খুঁটিপুজো ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। পুরনো কমিটির খুঁটিপুজোয় সনাতন ধর্মের অপমান হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে নতুন কমিটি ফের খুঁটিপুজোর আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির বর্ষীয়ান কাউন্সিলর মীনাদেবী পুরোহিত। বদলে দেওয়া হয় পুজোর শিল্পীকেও। জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের শিল্পী সুব্রত মৃধার পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয় সুশান্ত পালকে।
এ বছর সুশান্ত পালের পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপ। থিমের নাম ‘অরব’, যার ইংরেজি ব্যাখ্যা ‘বিয়ন্ড সাউন্ড’। শব্দের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে নীরবতার গভীরে পৌঁছনোর ভাবনা দর্শকদের আকর্ষণ করেছিল। সমাজমাধ্যমেও পুজোটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে।
অভিযোগ, সপ্তমীর বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সেই ভিড় সামলানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। অপরিসর গলির ভিতরে অবস্থিত মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, মণ্ডপের সংকীর্ণ প্রবেশপথে ভিড় নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না। প্রবল বৃষ্টির কারণে বেরোনোর মুখে দর্শনার্থীরা আটকে পড়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে দাবি করা হচ্ছে। অন্য দিকে, প্রবেশপথ দিয়ে মানুষের ঢোকা বন্ধ করা হয়নি বলেও অভিযোগ। ফলে সংকীর্ণ জায়গায় ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে।
এ ছাড়াও মণ্ডপ থেকে বেরোনোর পথে একাধিক সিঁড়ি থাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কয়েক জন পড়ে যেতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে প্রাথমিক অনুমান। দুর্ঘটনার সময় পুজো উদ্যোক্তাদের কাউকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি এবং দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ। যদিও এই অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল এখনও সামনে আসেনি।
দুর্ঘটনার পরেই থিম পুজোর মণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরু গলি এবং অন্ধকার মণ্ডপে বিপুল ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। শনিবার রাত থেকেই অন্যান্য পুজো মণ্ডপের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার কাজ পুলিশ ও দমকল শুরু করবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি ধরা পড়লে তা সংশোধন করার পরেই মণ্ডপ খোলার অনুমতি দেওয়ার কথা জানান তিনি।
তবে চোরবাগানের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আগে নিরাপত্তা পরিদর্শন হয়েছিল কি না, ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের অভিযোগ, পুরনো পুজো কমিটির সদস্যদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছিল। নতুন কমিটিতে কারা রয়েছেন, সেই তালিকাও সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি।
পুজো কমিটিতে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারীর যুক্ত থাকার প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করেন কুণাল। সমাজমাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “অপরাধী ভাইপোকে জেলে কবে ঢোকাচ্ছেন শুভেন্দুবাবু?” পাশাপাশি বিধায়ক বিজয় ওঝা এবং বিজেপি নেতা তমোঘ্ন ঘোষের গ্রেফতারির দাবিও জানান তিনি।
অন্য দিকে, পুজো কমিটি ‘হাইজ্যাক’ করার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “এখন কোনও রকম রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা নেই।”
চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্ঘটনা ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত মানুষের প্রাণহানির দায় কার? পুজো কমিটির প্রস্তুতি, প্রশাসনের নজরদারি, পুলিশের ভূমিকা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজের কার্যকারিতা—সব দিক খতিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে তদন্তে প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের আনন্দ যেন আর কখনও এমন মর্মান্তিক বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে চোরবাগানের ঘটনা।

