পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ওন্দা ব্লকের পুণিসোল গ্রাম—দীর্ঘদিন ধরেই নানান সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের ঠিকানা। এই গ্রামেরই এক পরিচিত নাম জলিলুর রহমান। গত ৪৪ বছর ধরে তিনি গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে, কুসংস্কার দূর করতে এবং মানুষকে সচেতন করতে কাজ করে গেছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘পুণিসোল আজমিয়া গ্রামীণ গ্রন্থাগার’, যা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের চিন্তাভাবনায় বদল আনে।
একসময় গ্রামের মানুষ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে খুব কম জানত। কিন্তু এই গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। মানুষ বই পড়তে শুরু করে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে। এখন ৬৬ বছর বয়সী জলিলুর রহমান অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। স্নায়ুর রোগে ভুগছেন তিনি। এমন সময়ে নতুন ভোটার তালিকায় তাঁর নামের পাশে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন লেখা দেখে তিনি কার্যত ভেঙে পড়েছেন।
জলিলুর রহমান জানান, অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি একাধিকবার ওন্দা ব্লক অফিসে গিয়েছেন। পাসপোর্ট, জমির কাগজ, পেনশনের নথি, সব জমা দিয়েও তাঁর নাম এখনও সন্দেহের তালিকায়।
এখানেই শেষ নয়, তাঁর মেয়ে রাবেয়া বিবি দলাল, যিনি পেশায় পুষ্টিকর্মী, তিনিও একই সমস্যায় পড়েছেন। ভোটার তালিকায় তাঁর নামও বিচারাধীন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ফলে গোটা পরিবারেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
শুধু একটি পরিবার নয়, পুণিসোল গ্রামের বহু মানুষ একই সমস্যার মুখোমুখি। প্রায় ৯০ হাজার মানুষের এই গ্রামে ভোটার সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। তার মধ্যে প্রায় ৮৬০০ জনের নামের পাশে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর থেকেই গ্রামে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। কেউ দিনমজুর, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউবা অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান। জীবিকা নির্বাহ করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বারবার কাজ ফেলে ব্লক অফিসে যেতে হচ্ছে শুনানির জন্য। এতে বাড়ছে আর্থিক চাপও। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, খসড়া তালিকা প্রকাশের পর তাঁদের বারবার ডাকা হয়। তাঁরা সমস্ত নথি জমা দেন এবং সংশোধনের কাজও করেন। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় এসে দেখা যাচ্ছে অন্য ছবি।
৮৬ বছরের আব্দুল সাবুর মোল্লা, যিনি বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, তিনিও এখন এই তালিকায়। এদিকে, পাশের নাটুনগ্রামেও একই ছবি। সেখানেও বহু মানুষের নাম ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও বলছেন। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নিয়ম মেনেই কাজ চলছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই এলাকায় বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। গ্রামবাসীদের একটাই দাবি, যে সব মানুষ প্রকৃত ভোটারদের অধিকার যেন কেড়ে নেওয়া না হয়। ভোটের আগে এই অনিশ্চয়তা দূর করার দাবিতেই এখন সরব পুণিসোল গ্রাম।


