উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের বাসুন্ধরা এলাকায় গত বৃহস্পতিবার হিন্দু রক্ষা দল নামে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন কেএফসি এবং নাজিরের মতো জনপ্রিয় নন-ভেজিটেরিয়ান রেস্তোরাঁর সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এই বিক্ষোভের কারণ ছিল হিন্দুদের পবিত্র শ্রাবণ মাসে মাংস বিক্রি, যে সময় শিবভক্তরা উপবাস, প্রার্থনা এবং কঠোর নিরামিষ খেয়ে জীবনযাপন করেন। কিন্তু আস্থার নামে একজনের উপরে জোর করে খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে এই ঘটনা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার উপর আঘাত হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা কানওয়ার যাত্রার পথের আশপাশের এলাকায় নন-ভেজিটেরিয়ান খাবারের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি তুলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, গেরুয়া পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা ‘জয় শ্রী রাম’ এবং ‘হর হর মহাদেব’ স্লোগান দিচ্ছে এবং ধর্মীয় পথের কাছে মাংস তৈরির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এক বিক্ষোভকারী বলেন, “আধ্যাত্মিক পথের কাছে মাংস তৈরির গন্ধ এবং দৃশ্য কানওয়ার যাত্রার ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে।” এই বিক্ষোভের অংশ হিসেবে হিন্দু রক্ষা দলের সদস্যরা কেএফসি রেস্তোরাঁর শাটার বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে।
এই সংগঠন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে, যাতে সাওয়ান মাস জুড়ে কানওয়ার যাত্রার পথের ১০০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে সব নন-ভেজিটেরিয়ান খাবারের দোকান বন্ধের দাবি করা হয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এই দাবি না মানলে তারা তাদের আন্দোলন আরও তীব্র করবে। সংগঠনের একজন মুখপাত্র বলেন, “এই পবিত্র সময়ে সবাইকে পরিবেশের পবিত্রতা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা উচিত।” কিন্তু এই দাবি এবং আচরণ সমাজে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাসের উপর জোর করে নিয়ন্ত্রণ চাপানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনা কেবল ধর্মীয় উৎসবের সময় সংবেদনশীলতার প্রশ্নই নয়, বরং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পছন্দের উপর আক্রমণ। কোনও সরকারি নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও এই উগ্র সংগঠন নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বা রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা আইনশৃঙ্খলার প্রতি প্রশ্ন তুলছে।
শ্রাবণ মাসে কানওয়ার যাত্রার সময় গাজিয়াবাদে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। এই সময়ে অনেকে উপবাস পালন করেন এবং মাংস, মদ, এমনকী পেঁয়াজ-রসুন পর্যন্ত এড়িয়ে চলেন। কিন্তু এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর এমন আচরণ সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে। এই ঘটনা শুধু গাজিয়াবাদের নয়, গোটা দেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। যখন একটি গোষ্ঠী নিজেদের বিশ্বাস অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়, তখন তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সহাবস্থানের চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কতদূর পর্যন্ত এই উগ্রতা চলবে? ব্যক্তিগত পছন্দের উপর এই হস্তক্ষেপ কি আমাদের সমাজের বহুত্ববাদী চরিত্রকে ধ্বংস করছে না? হিন্দু রক্ষা দলের মতো সংগঠনগুলোর এই আচরণ কেবল ধর্মীয় সংবেদনশীলতার নামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। এখন প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এবং সমাজের সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের, যাতে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকে।


