গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া গণহত্যার মামলায় নতুন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। দক্ষিণ আফ্রিকার করা এই মামলায় এবার যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ আদালতে হস্তক্ষেপের ঘোষণা জমা দিয়েছে। এর ফলে মামলাটি ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে শুরু করেছে।নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ১৩ মার্চ এক বিবৃতিতে জানায়, নামিবিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, হাঙ্গেরি এবং ফিজি আদালতের সংবিধির ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মামলায় হস্তক্ষেপের ঘোষণা জমা দিয়েছে। এই ধারার মাধ্যমে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে বিচার চলাকালে সেই চুক্তির সদস্য রাষ্ট্রগুলো মামলায় নিজেদের মতামত জানাতে পারে।এর আগেও নেদারল্যান্ডস এবং আইসল্যান্ড একই ধারায় আদালতে হস্তক্ষেপের আবেদন করেছিল। ফলে গাজা যুদ্ধ নিয়ে করা এই মামলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। এই মামলার আনুষ্ঠানিক নাম “গাজা উপত্যকায় গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশনের প্রয়োগ (দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল)”। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আদালতে এই মামলা দায়ের করে। তাদের অভিযোগ, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছে যা গণহত্যা সনদের আওতায় পড়ে।তবে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে। আদালতে জমা দেওয়া তাদের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ভিত্তিহীন। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার এই ধরনের অভিযোগ তুলে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে অবৈধ বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্রের মতে, গণহত্যা প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হবে। কেবল যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটলেই তা গণহত্যা হিসেবে ধরা যায় না—যদি না সেই ধ্বংসের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।ওয়াশিংটন আরও বলেছে, গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আদালতকে অত্যন্ত কঠোর প্রমাণের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি তারা উল্লেখ করেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধের সময় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটলেও তা সবসময় গণহত্যার ইঙ্গিত দেয় না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী যুদ্ধের সময় ‘অনুপাত’ এবং ‘বেসামরিকদের আলাদা করে দেখার’ নীতিগুলিও বিবেচনায় নিতে হবে।এই মামলায় ইতিমধ্যেই কলম্বিয়া, মেক্সিকো, তুরস্ক, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ব্রাজিল এবং বেলজিয়ামসহ একাধিক দেশ আদালতে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছে। ফলে মামলাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন করে জমা দেওয়া এসব ঘোষণার বিষয়ে ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে ইসরায়েলকে এমন সব পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বলেছিল, যা গণহত্যা সনদের আওতায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথও খোলা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়।তবে এই মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মামলাটি আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
Popular Categories


