Wednesday, October 21, 2026
25 C
Kolkata

মুম্বাই আদালতের রায়, শাহিদ আজমির সাহাদাতকে দিলো অমরত্বের ছোঁয়া

অসহায় সর্বহারাদের মাসিহা ছিলেন শাহিদ আজমি। গরিব পিছিয়ে পড়া, ভারত সরকার দ্বারা নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন জন্ম হয়েছিল শাহিদ আজমির। ১৯৯২ সালের দাঙ্গা শাহিদের জীবনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শাহিদ দেখেছিলেন কিভাবে ভারতের নিরপরাধ সাধারণ মুসলমানরা ভারতের পুলিশের হাতে নিপীড়িত হচ্ছে। এরপর যদিও ১৯৯৪ সালে শাহিদকে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে TADA আইনে গ্রেফতার করা হয়। জেলে শাহিদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়। শুধু তাই নয়, ভুয়ো অস্বীকারোক্তি দিতেও বাধ্য করা হয়। তবে শাহিদ ছোটবেলা থেকে ছিলেন অদম্য জেদি। শাহিদকে দমিয়ে রাখার শ্রাদ্ধ পৃথিবীর কোন কারাগারে নেই। জেলে বসে শাহিদ আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। অদম্য জেদ, এবং গভীর অধ্যাবসায়ের ফলে শাহিদ নিজেকে আইনজীবী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০৩ সালে তিনি প্রথম একজন আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন, শুধুমাত্র অসহায় দরিদ্র ও নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য। তার ৭ বছরের দীর্ঘ আইনজীবী পেশায় ১৭ টি গুরুত্বপূর্ণ কেসে তিনি জয়লাভ করেন। ২০০৬ সালে ঘটে যাওয়া নারকীয় ট্রেন বিস্ফোরণে মূল অভিযুক্তদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন শাহিদ আজমি। এর পর শাহিদ বারবার আদালতে পিটিশন দিয়ে পুলিশের অত্যাচার ও জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। শাহিদ মৃত্যুর হুমকি পেলেও পুলিশ কোনও সুরক্ষা দেয়নি। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে, মাত্র ৩২ বছর বয়সে, চারজন ভুয়া ক্লায়েন্ট তার অফিসে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে।

বীর, মানবদরদি আইনজীবী শাহিদ আজমি শাহাদাতের ঠিক দু’বছর পর মুক্তি পায় রাজকুমার রাও অভিনীত ‘শাহিদ’ নামক ছবিটি। বলা হয় এই সিনেমাটি শাহিদ আজমির জীবনেকে উৎসর্গ করে বানানো হয়েছে।

২০০৬ সালে মুম্বাইয়ে লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণের ঘটনার ১৯ বছর পার হয়ে গিয়েছে। অবশেষে গত সোমবার, বিস্ফোরণের ঘটনার দোষীসাব্যস্ত সকলকে মুক্তির নির্দেশ দিলেন বোম্বে হাইকোর্ট। এই বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় ১৯০ সাধারণ মানুষের, আহত হন আনুমানিক ৭০০ জন। ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থা ঘটনার তদন্ত করে, লস্কর এ তাইবা এবং সিমিকে এই ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে দায়ী করে। ১২ জনকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে ৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনানো হয়। বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনানো হয়। যে ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে মূল অভিযুক্ত কালাম আনসারি নাগপুর জেলে বন্দি থাকার সময় কভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাকি অভিযুক্তরা দায়রা আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানান, এবং বোম্বে হাইকোর্টের দার্শস্থ্য হন। এই আপিলের শুনানি করেন, বিচারপতি শ্যাম চন্দ্রক ও বিচারপতি অনিল কিলোর একটি বেঞ্চ।

দীর্ঘ ১৯ বছর কারাগারে থাকার পর অবশেষে সসম্মানে মুক্তি পেলন ২০০৬ সালে মুম্বাইয়ে লোকাল ট্রেন বিস্ফোরণের মূল অভিযুক্তরা। মুম্বাই আদালতের বিচারপতিদের বক্তব্য, কিসের ভিত্তিতে দায়রা আদালত ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঘোষণা করেছেন তা বোঝা দায়। দায়রা আদালতের নির্দেশকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে মুম্বাই আদাল। গত সোমবার মুম্বাই আদালতের দুই বিচারপতি অনিল কিলোর, এবং শ্যাম চন্দ্রক, সব অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এই ১১ জন মুসলমান নিরাপরাধ মানুষদের ১৯ টা বছর ফিরিয়ে দেবেকে? ঘটনা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী শামীম আহমেদ নিবিটিভিকে জানিয়েছেন, “প্রথমে আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে, বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইনভেস্টিকেটিভ এজেন্সি গুলি যথেষ্ট নথি এবং তথ্য পেশ করা সত্ত্বেও মূল অপরাধীকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে সমাজে অপরাধের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে এবং অপরাধীদের ইন্ধন দেওয়া হবে।” তিনি আরো জানান, “যাদেরকে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ গুলোই সন্ত্রাসবাদী, এমন একটি মিথ্যে ধারণা সমাজের বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত হিসেবে নিরাপরাধ মানুষদের আটক করে কাস্টাডিয়াল ট্রায়ালের মধ্যে রাখা হচ্ছে। বিচার শেষ হতে ১২, ১৫ কিংবা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। একজন নিরাপরাধ মানুষের জীবন থেকে যদি এতগুলো বছর কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে, ওই মানুষগুলোর কাছ থেকে সংবিধানের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তদন্তকারী সংস্থা নিরপেক্ষ না হওয়ার কারণে একজন মানুষকে অকারনে বছরের পর বছর সাজা ভোগ করতে হচ্ছে। আসল অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে না আসতে পারার কারণে, অপরাধীদের ইন্ধন যোগানো হচ্ছে। যার ফলে অপরাধের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তদন্তকারী সংস্থা, রাজনৈতিক দলগুলির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।”

মুম্বাই আদালতের এই রায়তে শুধু মাত্র ১১ জন নিরাপরাধ বেকসুর খালাস পেল তা নয়, এই রায় শাহিদ আজমির সাহাদাতকে দিলো অমরত্বের ছোঁয়া।

Hot this week

থিমের দাপট বন্ধ হোক, হইহুল্লোড় নয়’, আগামী বছর থেকে সাত্ত্বিক পুজোর ডাক কৌস্তভ বাগচীর!

চোরবাগানের দুর্গাপুজো মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার পর পুজোর...

খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজা, বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ার সুযোগ দিতে সাজা স্থগিত করল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ...

চোরবাগানে ১৯ জনের মৃত্যুর পর প্রশ্নের মুখে পুলিশি নিরাপত্তা, দায়িত্বে ছিলেন দুই ডিসি!

দুর্গাপুজোর ভিড় সামলাতে কলকাতা পুলিশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বরাবরই প্রশংসা...

‘নীতীশকে সাহায্য করতে ৯ জনকে খুন!’ বিস্ফোরক দাবি অনন্ত সিংয়ের, বিতর্কের মুখে সুর বদল বিধায়কের

বিহারে বিধান পরিষদের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই নতুন...

Topics

থিমের দাপট বন্ধ হোক, হইহুল্লোড় নয়’, আগামী বছর থেকে সাত্ত্বিক পুজোর ডাক কৌস্তভ বাগচীর!

চোরবাগানের দুর্গাপুজো মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার পর পুজোর...

খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজা, বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ার সুযোগ দিতে সাজা স্থগিত করল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ...

চোরবাগানে ১৯ জনের মৃত্যুর পর প্রশ্নের মুখে পুলিশি নিরাপত্তা, দায়িত্বে ছিলেন দুই ডিসি!

দুর্গাপুজোর ভিড় সামলাতে কলকাতা পুলিশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বরাবরই প্রশংসা...

‘নীতীশকে সাহায্য করতে ৯ জনকে খুন!’ বিস্ফোরক দাবি অনন্ত সিংয়ের, বিতর্কের মুখে সুর বদল বিধায়কের

বিহারে বিধান পরিষদের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই নতুন...

চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু, পুজো কমিটির দখল নিয়ে বিতর্ক! নিশানায় বিজেপি নেতৃত্ব

উৎসবের আবহে বিষাদের ছায়া। চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে...

Related Articles

Popular Categories