বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকের একটি ছোট গ্রাম পলাশবুনী। চারপাশে পাথর ভাঙার কারখানার ধুলোয় ঢাকা এই এলাকা আজ এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা প্রায় সত্তর বছর বয়সী ইমানি মোমিন। মাটির বাড়িতে টিনের ছাউনি তলায় তাঁর দিন কাটে চরম অসুস্থতার মধ্যে। শরীর ভেঙে পড়েছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, আর বেশিরভাগ সময় বিছানাতেই পড়ে থাকতে হয় তাঁকে। পাশে বসে তাঁর স্ত্রী ফুলমনি, স্বামীর কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করলেও কার্যত কিছুই করার নেই।ইমানি মোমিন বহু বছর পাথর খাদানে কাজ করেছেন। সেই কাজের ধুলোই ধীরে ধীরে তাঁর ফুসফুস নষ্ট করে দিয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি সিলিকোসিস নামের এক জটিল রোগে আক্রান্ত। এই রোগে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শ্বাসকষ্ট ক্রমশ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এখন তিনি কার্যত অচল।অভাবের সঙ্গে লড়াই এই পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা। কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ায় সংসারে রোজগার বন্ধ। ফুলমনি জানান, সামান্য সাহায্য পেলেই তাঁদের কিছুটা স্বস্তি মিলত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সরকারি ক্ষতিপূরণ পাননি তাঁরা। অথচ প্রায় এক বছর আগেই তাঁর স্বামীর অসুখ ধরা পড়েছে।শুধু ইমানি মোমিন নন, এই অঞ্চলে আরও বহু মানুষ একই রোগে আক্রান্ত। পাথর খাদান এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আরও বেশ কিছু নতুন রোগীর সন্ধান মিলেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন শিবিরে বহু মানুষের পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এই রোগে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হয়েছে। ফলে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেকেই এখনও পরীক্ষার আওতায় আসেননি। এদিকে এই রোগে ইতিমধ্যেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলেও জানা গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসাম্য দেখা যাচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক মানুষ সরকারি সাহায্য পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ক্ষতিপূরণ পেতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এমনকি দাবি আদায় করতে আন্দোলনেও নামতে হয়েছে কিছু মানুষকে।স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীরা জানাচ্ছেন, এই রোগে আক্রান্তরা অধিকাংশই দরিদ্র শ্রমিক। তাঁদের জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে সেই সাহায্য পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, কেন এত দেরি হচ্ছে ক্ষতিপূরণ দিতে। প্রশাসনের তরফে আশ্বাস মিললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফলে ইমানি মোমিনের মতো অসংখ্য মানুষ এখনো অপেক্ষা করে আছেন যে কবে মিলবে সেই প্রাপ্য সাহায্য, যা তাঁদের জীবনে সামান্য হলেও স্বস্তি আনতে পারে।
বীরভূমের পলাশবুনিতে বাড়ছে সিলিকোসিসে আক্রান্তের সংখ্যা, ক্ষতিপূরণ না পেয়ে ও মৃত্যুর মুখে অসহায় শ্রমিকেরা
Popular Categories


