বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর ২৪ পরগনায় তৃণমূল কংগ্রেসের খারাপ ফলের পর দলীয় অন্দরে অসন্তোষ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বারাসত ও বারাকপুর-সহ জেলার একাধিক কেন্দ্রে পরাজয়ের পর এবার জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন তৃণমূল সাংসদ ডা. কাকলি ঘোষ দস্তিদার। রবিবার তিনি দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠান। সেখানে পরাজয়ের নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
এদিকে কাকলির পদত্যাগের পর সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সমাজমাধ্যমে করা তাঁর পোস্টে কাকলির ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানানো হলেও, সেই বার্তায় কটাক্ষের সুরও ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের মত। তিনি লেখেন, ভবিষ্যতের পথ মসৃণ হোক এবং এতদিনের বিতর্ক ও অভিযোগ হয়তো এবার মুছে যাবে। কল্যাণের এই মন্তব্য ঘিরেও তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে শুধু পদত্যাগেই থেমে থাকেননি কাকলি। চিঠি ও পরে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নাম না করলেও তাঁর নিশানায় ছিল দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আইপ্যাক। কাকলির বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে যারা মাঠে থেকে দলের হয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কিছু পরামর্শদাতার আচরণ অনেক সময় অসম্মানজনক ছিল।
সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, তিনি নিজে কোনওদিন আইপ্যাককে নিয়োগ করেননি। কিন্তু বাইরে থেকে আসা কিছু তরুণ কর্মীর আচরণে বহু পুরনো কর্মী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাঁর দাবি, গত ১৭ বছর ধরে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর অফিস সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় খোলা থাকত। এলাকার সাতটি বিধানসভায় উন্নয়নমূলক কাজও হয়েছে। তবু ভোটের ফল জানিয়ে দিয়েছে, মানুষের একাংশ দলকে আর আগের মতো গ্রহণ করছে না।
এদিন কাকলি আরও বলেন, দলের ভিতরে বিভিন্ন স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে বলে তাঁর মত। পাশাপাশি তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, আগের মতো অভিজ্ঞ ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের গুরুত্ব দিলে দলের ভাবমূর্তি ফের উজ্জ্বল হতে পারে। হঠাৎ তৈরি হওয়া সংস্থার উপর ভরসা করে বড় রাজনৈতিক লড়াই জেতা কঠিন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ডা. কাকলি ঘোষ দস্তিদার দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত মুখ। আন্দোলনের সময় থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে তাঁকে দেখা গিয়েছে। তিনি টানা তিনবার বারাসত থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী হওয়ার পাশাপাশি লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর সেই চিফ হুইপের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দায়িত্ব দেওয়া হয় বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই সময় সামাজিক মাধ্যমে কাকলির একটি পোস্ট ঘিরেও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। সেখানে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় লেখেন, চার দশকের আনুগত্যের এটাই পুরস্কার।
এবার তাঁর ইস্তফার পর বিষয়টি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। কাকলির এই সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, যদি এত সমস্যা আগে থেকেই জানা ছিল, তাহলে তা দলের ভিতরে আরও আগে তুলে ধরা হল না কেন? ভোটের পর প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেওয়াকে অনেকে দলের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন।


