বই ছুড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন কয়েক জন যুবক। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় অনুরোধ করছেন এক প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁর আবেদন, বইগুলি যেন নষ্ট না করা হয়। নাগেরবাজারে বামেদের বইয়ের স্টলে হামলার সেই ভিডিয়োই পুজোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে। আর সেই ভিডিয়োর সুবাদে বহু মানুষের নজরে এসেছেন দমদমের বাসিন্দা বিপুল দাশগুপ্ত। এলাকায় তিনি পরিচিত ‘বুজুদা’ নামে।সত্তর পেরোনো বিপুল দীর্ঘদিন ধরে সিপিএমের সর্বক্ষণের কর্মী। নাগেরবাজারে বামেদের বইয়ের স্টলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রায় চার দশকেরও বেশি সময়ের। ১৯৭৯ সাল নাগাদ এই বইয়ের স্টল চালু হওয়ার পর থেকেই তিনি তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে এমন হামলার ঘটনা আগে দেখেননি তিনি।বই নষ্ট করার চেষ্টা দেখে যুবকদের সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন বিপুল। তাঁর এই আচরণে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন বহু মানুষ। তবে সমাজমাধ্যমে নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে বিশেষ আগ্রহ নেই তাঁর। বিপুলের কথায়, পরিস্থিতিতে যা করা প্রয়োজন ছিল, তিনি শুধু সেটুকুই করেছেন। ভবিষ্যতেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।বিপুলের বক্তব্য, তিনি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মী। বই বাঁচানোর প্রতিবাদ শুধু তাঁর একার নয়। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বহু মানুষ নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাই ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসা পাওয়ার মধ্যে আলাদা করে আনন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।বইয়ের প্রতি বিপুলের টান দীর্ঘদিনের। অবসর সময়ে লালন ফকির, শাহ আবদুল করিম এবং বাংলাদেশের লেখকদের বই পড়েন তিনি। পাশাপাশি রামায়ণ, মহাভারত, দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন ও চিন্তাভাবনা এবং মার্কসবাদ নিয়েও পড়াশোনা করেন। তাঁর মতে, বই পড়ে যে শিক্ষা পেয়েছেন, সেই শিক্ষাই তাঁকে ওই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে।বইয়ের উপর হামলার প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছেন বহরমপুরের চক্ষু বিশেষজ্ঞ অশোককুমার ভকতও। বিভিন্ন বইয়ের স্টল থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার বই কিনে পুজো দেখতে আসা তরুণদের মধ্যে সেগুলি বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। অশোকের বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বইয়ের উপর আক্রমণের প্রতিবাদ জানাতেই এই উদ্যোগ।কলকাতার কসবাতেও বইয়ের স্টল করতে অনুমতি নিয়ে সমস্যার মুখে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা মিলন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের গ্যারাজে সেই স্টল চালানোর ব্যবস্থা করেছেন। বইকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এমন উদ্যোগে আশাবাদী বিপুল। তাঁর বিশ্বাস, তরুণদের মধ্যে আবার বই পড়ার আগ্রহ বাড়ছে। নানা ধরনের বইয়ের প্রতি নতুন প্রজন্মের এই টানকেই ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন তিনি।
Popular Categories


