মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পৌর নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এতদিন বিজেপির ‘বি-টিম’ বা মুসলিম ভোট কাটার দল হিসেবে পরিচিত আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) এখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। এই নির্বাচনেই প্রথমবার স্পষ্ট হয়েছে যে, ওয়াইসির দল ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মুসলিম ভোটারদের একটি অংশ কেবল মুসলিম সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এবং একজন মুসলিম নেতার নেতৃত্বাধীন দলকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছে। যদি এই প্রবণতা বাড়ে, তাহলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে সমাজবাদী পার্টি এবং আরজেডির মতো দলগুলোর মুসলিম-যাদব ভোটব্যাঙ্ক দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে কংগ্রেস যে মুসলিম ভোট পেয়ে থাকে, যা সারা দেশে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ, সেটিও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির অবস্থানও এতে দুর্বল হতে পারে।
কিছু মহল মনে করছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার আগের সময়ের মতো হয়ে উঠছে। তখন একদিকে ছিল কংগ্রেস, আর অন্যদিকে মুসলিম লীগের মতো দল। পার্থক্য হলো, এখন কংগ্রেসের জায়গায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে বলেই ধারণা। তবে সবাই এই সিদ্ধান্তে এত দ্রুত পৌঁছাতে নারাজ। কারণ, ওয়াইসির প্রভাব এখনও মূলত শহর ও আধা-শহরের মুসলিম ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ মুসলিম সমাজে তাঁর দলের উপস্থিতি এখনো তেমন শক্ত নয়। পাশাপাশি, মিম বর্তমানে মাত্র তিনটি অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এই অঞ্চলগুলো হলো পুরনো শহর হায়দরাবাদ, যেখানে ১৯৬৭ সালে ওয়াইসির বাবা সুলতান সালাহউদ্দিন ওয়াইসি এই দল প্রতিষ্ঠা করেন; বিহারের সীমাঞ্চল এলাকা, যেখানে মিম মহাজোটের ক্ষতি করে ভালো ফল করেছে; এবং মহারাষ্ট্রের কয়েকটি পৌর কর্পোরেশন, যেখানে দলটি বিজেপি ও এনসিপিকে পিছনে ফেলেছে। অন্যদিকে, কিছু জায়গায় মিমের উপস্থিতি বিজেপিকেই সুবিধা করে দিচ্ছে। দিল্লির মুস্তাফাবাদ আসন এবং উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি আসনে তার উদাহরণ দেখা গেছে। সম্প্রতি ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পরে ওয়াইসিকে সরকারের সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় মুসলমানদের মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে। এদিকে, মুসলিম ভোটারদের একাংশ অমুসলিম নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর হতাশ। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে ওয়াইসির উত্থান কি সত্যিই ভারতের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করছে, নাকি এটি কেবল কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ একটি প্রবণতা? এর উত্তর সময়ই দেবে।


