ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নে ছত্তীসগড় ফের একবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনন্দগাঁও জেলার একটি খ্রিস্টান পরিবার সম্প্রতি যে চরম নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং রাজ্যে এবং বৃহত্তর ভারতবর্ষে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ঘিরে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
জানা গেছে, ওই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের বাসিন্দা। ভিক্রম নামে এক কৃষিজীবী ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে এই গ্রামেই বসবাস করতেন। সম্প্রতি গ্রামসভায় তাঁদের ডেকে ‘ঘর ওয়াপসি’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে হিন্দু ধর্মে ফিরতে বলা হয়। ধর্মান্তরের সেই নির্দেশ তাঁরা প্রত্যাখ্যান করতেই একদল গ্রামবাসী তাঁদের উপর চড়াও হয়। বাড়িঘর তছনছ করে দেওয়া হয়, খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়, এমনকি মেয়েদের ক্ষেত্রেও অপ্রীতিকর আচরণের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে পরিবারটিকে প্রাণরক্ষায় গ্রাম ছেড়ে পাশের একটি জঙ্গলে আশ্রয় নিতে হয়।

এই ঘটনাটি কিন্তু প্রথম নয়। পরিবারটি আগেও একাধিকবার ধর্মান্তরের চাপের মুখে পড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। যদিও ঘটনার পর থানায় অভিযোগ জানানো হয়েছে, তবু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং স্থানীয় স্তরে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদি তারা খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ না করে, তাহলে তাদের গ্রামে ফিরে আসার অনুমতি নেই।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন, ছত্তীসগড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। “ঘর ওয়াপসি” নামের যে প্রচার চলছে, তা বহু ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছায় নয়, বরং চাপ ও ভয় দেখিয়ে ধর্মান্তরের চেষ্টার নামান্তর।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ছত্তীসগড়ে খ্রিস্টান জনসংখ্যা মাত্র ১.৯%। এই স্বল্পসংখ্যক মানুষদের লক্ষ করে নিরন্তর চালানো ধর্মীয় নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও রাজনৈতিক মদতে এই প্রবণতা আরও বেশি মাত্রা নিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

যদিও ছত্তীসগড়ে ১৯৬৮ সাল থেকেই ধর্মান্তর বিরোধী আইন চালু আছে, এবং ২০০৬ সালের সংশোধনে এই আইন আরও কঠোর হয়েছে, তবুও বাস্তবে এই আইন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার উদাহরণই বেশি। আইন অনুসারে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক হলেও, হিন্দু ধর্মে ‘ফিরে আসা’—অর্থাৎ পুনঃধর্মান্তর—এই আইনের বাইরে রয়ে যায়। এই আইনি অসাম্যই এখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই সারা দেশে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ঘটনার সংখ্যা ২৪৫। এর মধ্যে শুধু ছত্তীসগড়েই ঘটেছে ৪৬টি হামলা—যা রাজ্যটির নাম উত্তরপ্রদেশের পরই স্থান দিয়েছে।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবেন—এমন চিত্র আজকের ভারতে ভাবাই কঠিন। অথচ বাস্তব বলছে, তা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে মৌলিক অধিকার, সাংবিধানিক নিরাপত্তা এবং মানবিক সহাবস্থানের প্রশ্নে আমাদের এখনই গভীর আত্মপোলব্ধির প্রয়োজন। কারণ, কোনও সমাজেই ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষের উপর এই ধরনের নিপীড়ন সভ্যতার পরিচায়ক হতে পারে না।


