মুর্শিদাবাদের ডোমকলে রাজনৈতিক পালাবদলের এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায় লেখা হল গত বৃহস্পতিবার। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দখল থেকে নিজেদের পার্টি অফিস পুনরুদ্ধার করল সিপিআইএম। শুধু তাই নয়, বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে ডোমকল পুরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের একঝাঁক তৃণমূল কর্মী-সমর্থক বামপন্থী দলে ফিরে এলেন। এই যোগদান শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি ডোমকলে দলীয় বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্নীতি আর গণবিরোধীতার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস ।
এখন প্রশ্ন হল কেন ফিরলেন কর্মীরা?
যোগদানকারী আক্কাস মোল্লার কথায় ফুটে উঠেছে ক্ষোভের কারণ: “টাকা-পয়সা একেবারে লুঠেপুটে খাচ্ছে দলীয় নেতারা। গরিব মানুষের ঘর বানানোর সরকারি টাকাও পৌঁছায় না হাতেপাতে। এজন্যই আমরা শপথ নিয়েছি—এখন শুধু সিপিআইএমকেই শক্ত করে ধরব।” সুজন মণ্ডল নামে অন্য এক যোগদানকারীর অভিযোগ আরও স্পষ্ট: “এমএলএ সাহেব আর তাঁর ভাইয়েরা শুধু বসে আছেন, রাস্তাঘাটের কোনও উন্নয়ন হয়নি। গরিব মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন ঘর দেওয়ার নাম করে টাকা কেটে নেওয়ায়” ।
তৃণমূলের জবাব: “মিথ্যে অভিযোগ!”
যদিও তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা এই যোগদানকে হালকাভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। ডোমকল ৪৪ নং বুথের সভাপতি বাবর আলি মণ্ডল দাবি করেন, “এখানে কোনো যোগদান হয়নি—পিকনিকের ছবি তুলে প্রচার করা হচ্ছে!” ১৬ নং ওয়ার্ড তৃণমূল সভাপতি জাহাঙ্গির মণ্ডল আরও আত্মবিশ্বাসী: “২০২৬-র ভোটে তৃণমূল ছাড়া কোনো দল টিকতে পারবে না। এগুলো শুধু কৌশল, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে”।
স্থানীয় সূত্র বলছে, এই ওয়ার্ড একসময় সিপিআইএমের শক্ত ঘাঁটি ছিল। কিন্তু ২০২১-র বিধানসভা নির্বাচনের আগে একঝাঁক নেতা-কর্মী তৃণমূলে চলে যান। তারপর থেকেই এলাকায় আবাস যোজনা, রাস্তা নির্মাণের মতো প্রকল্পগুলি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যোগদানকারীরা সরাসরি দায় চাপিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্বের উপর—টাকা লোপাট, উন্নয়ন ব্যর্থতার অভিযোগে ।
দিকে দিকে এখন একটাই প্রশ্ন ডোমকলের এই পালাবদল কি রাজ্যের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত?
সিপিআইএমের ডোমকল এরিয়া কমিটির সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান এ নিয়ে আশাবাদী: “দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের রাগ এখন স্পষ্ট। গরিব মানুষ বুঝতে পারছে, কে তাদের প্রকৃত পাশে দাঁড়ায়।” এই পরিবর্তন শুধু ডোমকল নয়—সমগ্র মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন বিধানসভা নির্বাচন কয়েক মাসের দূরত্বে ।
ডোমকলে সিপিআইএমের পার্টি অফিসে আবারও উড়ছে লাল পতাকা—এটি শুধু একটি পার্টি অফিস পুনরুদ্ধারের গল্প নয়, এটি হল সেই স্থানীয় মানুষের জয় যারা পাঁচ বছর ধরে দুর্নীতি আর তোলাবাজির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিলেন। বিধানসভা ভোটে এই ঘটনা কি ডিভিডেন্ড দেবে বাম দলকে? সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত—ডোমকল আজ প্রমাণ করল, “যে দল গরিবের স্বপ্নের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তার পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা”।


