ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও অস্থিরতার মেঘ ঘনাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান যেন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, সেখানে নেতানিয়াহু ফের সামরিক পথেই এগোতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের সামনে যুদ্ধ এড়িয়ে ‘কঠোর কিন্তু সীমিত’ অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেন। কিন্তু ইসরায়েল সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গ কিছুটা আড়ালে চলে যেতেই এবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সামনে এনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা চলছে।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই অঞ্চল আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করাই নতুন লক্ষ্য। অথচ ইসরায়েলি নেতৃত্ব চাইছে এমন এক পরিস্থিতি, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক ফারাক। ট্রাম্প যেখানে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ থেকে সরে এসে ঘরোয়া রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে চান, সেখানে নেতানিয়াহু আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে সামরিক শক্তির ওপরই বেশি নির্ভরশীল। একাধিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের পর্যবেক্ষণ বলছে, ইরান ইস্যুতে লক্ষ্যবস্তু বদলানো—কখনো পারমাণবিক কর্মসূচি, কখনো ক্ষেপণাস্ত্র—এই কৌশল আসলে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করারই একটি উপায়।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ লবি ও প্রভাবশালী সমর্থকেরা দাবি করছেন, ইরান এখনো বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রেখেছে এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অন্যদিকে তেহরান বরাবরের মতোই বলে আসছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা আত্মরক্ষামূলক এবং তারা বিনা উসকানিতে কোনো আগ্রাসন চালায়নি। সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রথম হামলা কারা শুরু করেছিল—এই প্রশ্নও আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে।
মার্কিন রাজনীতির ভেতরেও এই প্রশ্নে বিভাজন স্পষ্ট। রিপাবলিকান দলের একাংশ এখন আর বিদেশি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারার নেতারা খোলাখুলিই ইরানবিরোধী যুদ্ধে আপত্তি জানাচ্ছেন। তবে কংগ্রেসের বড় অংশ এবং প্রভাবশালী দাতাদের চাপ ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি ইসরায়েল একতরফাভাবে ইরানে হামলা শুরু করে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আগের মতো সংযত প্রতিক্রিয়া নাও দেখাতে পারে তেহরান। সেক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলই বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্প কি সত্যিই তার ঘোষিত নীতিতে অটল থাকবেন, নাকি দীর্ঘদিনের মিত্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন? মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সংঘাতের এই টানাপোড়েনের মাঝেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে, যার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলেই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও পড়বে।


