
সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা ডায়ালগ ফোরামে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শাহিদ সমশাদ মির্জা এক জোরালো বক্তব্যে কাশ্মীর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার সুযোগ হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। “আঞ্চলিক সঙ্কট ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া” শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং স্থায়ী সমাধানই এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাঁর মতে, জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসারে কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান রেখে এই সমস্যার পূর্ণ সমাধান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি অসম্ভব।
জেনারেল মির্জার এই হুঁশিয়ারির পেছনে সাম্প্রতিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত “অপারেশন সিঁদুর” চালিয়ে পাকিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে। পাল্টা হামলায় দুই দেশের মধ্যে চারদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় মে মাসের শুরুতে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে থামে। মির্জা এই ঘটনাকে উদাহরণ টেনে বলেছেন, “ভবিষ্যতেও যদি এমন সংকট তৈরি হয়, বিশ্বশক্তিগুলোর পক্ষে সময়মতো হস্তক্ষেপ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা অসম্ভব হয়ে উঠবে।”
সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা ডায়ালগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল শাহিদ সমশাদ মির্জা কাশ্মীর ইস্যুতে “সময় ফুরিয়ে আসছে”-র যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভারতের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মহল তা প্রত্যাখ্যান করে। ভারতের স্পষ্ট অবস্থান হলো, কাশ্মীর কোনো আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং একমাত্র সমস্যা পাকিস্তান-প্রশ্রয়প্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদ। ভারতের সেনা সর্বাধিনায়ক জেনারেল অনিল চৌহান একই ফোরামে এই বার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, “কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এবং সেখানে শান্তি ফিরে আনতে পাকিস্তানকে সীমান্তে সন্ত্রাসী শিবির বন্ধ করতে হবে।”
ভারতের এই দৃঢ় অবস্থানের পেছনে ঐতিহাসিক ও বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক মহারাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ। অন্যদিকে, পাকিস্তান ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সংকটকে জটিল করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁওয়ের নির্মম জঙ্গি হামলায় ২৬ ভারতীয় প্রাণ হারালে ভারত “অপারেশন সিঁদুর”-এর মাধ্যমে পাকিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে। এই অভিযান প্রমাণ করে, ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করে চলবে।
জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার বিষয়টিকেও ভারত সন্দেহের চোখে দেখে। ২০১৯ সালে যখন ভারত সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে, তখন পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি তোলার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। এটি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক স্তরে বেশিরভাগ দেশগুলি ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। বর্তমানে ভারতের কৌশল হলো তিনটি স্তরে এগোনো: প্রথমত, কাশ্মীরে অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১২,০০০ কোটি টাকার পরিকাঠামো তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন; দ্বিতীয়ত, জি২০ সম্মেলনের মতো ফোরামে কাশ্মীরকে “ভারতের উন্নয়ন মডেল” হিসেবে উপস্থাপন; এবং তৃতীয়ত, সিয়াচেন থেকে লাইন অব কন্ট্রোল পর্যন্ত সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা (জিডিপি মাত্র ২৮৬ বিলিয়ন ডলার) এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের দাবিকে দুর্বল করে তুলেছে। অন্যদিকে, ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি (জিডিপি ৪ ট্রিলিয়ন ডলার) ও শক্তিশালী মিত্র রাষ্ট্রগুলির সমর্থন ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। পাক জেনারেল মির্জার “মধ্যস্থতার সময় ফুরিয়ে আসছে”-র বক্তব্য ভারতের দৃষ্টিতে একটি বিভ্রান্তি। কারণ, ভারত বিশ্বাস করে না যে কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বরং তাদের জোরালো যুক্তি হলো, পাকিস্তান যদি সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করে এবং সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আগ্রহ দেখায়, তবেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব। নতুবা, “অপারেশন সিঁদুর”-এর মতো অভিযান ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে—এটাই ভারতের অনমনীয় সতর্কবার্তা।


