মেঘালয়ের পশ্চিম গারো হিলস জেলায় সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ঘটনার জেরে আতঙ্কের মধ্যে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বহু মুসলিম পরিবার। ১০ মার্চ ভোর হওয়ার আগেই অনেকেই চুপিসারে এলাকা ছাড়েন বলে জানা যায়। কেউ প্রতিবেশী রাজ্য অসমে চলে গিয়েছেন, আবার কেউ আশপাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বহু মহিলা ও শিশু নিরাপত্তার কারণে পুরো এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।
এই অশান্তির মধ্যেই প্রাণ হারান দুই মুসলিম বাসিন্দা—খায়রুল ইসলাম ও আশরাফুল ইসলাম। ১০ মার্চ তাদের দেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেছে, একজনের মৃত্যু হয়েছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এবং অন্যজনের মৃত্যু হয়েছে দেশি পিস্তলের গুলিতে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ৯ মার্চ। সেদিনই ছিল গারো হিলস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (জিএইচএডিসি) নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রথম দিন। ওই দিন ফুলবাড়ির প্রাক্তন বিধায়ক এস. জি. এসমাতুর মোমিনিন এবং আরও এক প্রার্থী তুরা ডেপুটি কমিশনারের দপ্তরে মনোনয়ন জমা দিতে গেলে কিছু বিক্ষোভকারী তাদের বাধা দেয়। অভিযোগ, অ-উপজাতি প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
চিবিনাং ও তুরা বাজার এলাকায় কয়েকটি মুসলিম মালিকানাধীন দোকানে হামলা চালানো হয়। প্রায় ৩০টিরও বেশি দোকান ভাঙচুর বা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি মসজিদেও আগুন লাগানো হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এমনকি মসজিদের ইমামকে মারধরের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে উস্কানিমূলক স্লোগান শোনা গেছে। সেখানে মুসলিমদের বাংলাদেশ থেকে আসা “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” বলে উল্লেখ করা হয় এবং তাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। জেলায় কারফিউ জারি করা হয় এবং গারো হিলসের বিভিন্ন জেলায় ৪৮ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। সেনা মোতায়েনের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও অনেক পরিবার এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মেঘালয় সরকার ১১ মার্চ জিএইচএডিসি নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনার্ড কে. সাংমা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এলাকায় এখনও চাপা উত্তেজনা বজায় রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।

