ধর্মের বিভাজনের নানা কথাবার্তার মাঝেও কখনও কখনও উঠে আসে মানবতার এমন কিছু দৃশ্য, যা মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। নদিয়ার করিমপুর এলাকার একটি গ্রামে তেমনই এক ঘটনায় আবারও সামনে এল মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর গল্প।
করিমপুর দুই নম্বর ব্লকের থানারপাড়া পীরতলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা রবি কর্মকার দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর সম্প্রতি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক। বাড়ির সদস্যরা তখন কার্যত অসহায় অবস্থায় পড়ে যান বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষজন।
এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন পাড়ার কয়েকজন মুসলিম যুবক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুদ্দুস শেখ, আরেজুল্লা শেখ, হাফিজুল শেখ, আমানুল্লা শেখ, আরিফ শেখ ও উকিল শেখ। রোজার মাসে উপবাস অবস্থায় থেকেও তাঁরা প্রতিবেশীর পরিবারের পাশে দাঁড়ান।
গ্রামের মানুষজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তাঁরা শেষকৃত্যের সমস্ত আয়োজন করেন। বাঁশ কেটে খাটিয়া তৈরি করা থেকে শুরু করে মৃতদেহ ফুলে সাজানো—সব কাজই নিজেদের হাতে করেন ওই যুবকেরা। ভোরে সেহরি খাওয়ার পর রোজা অবস্থাতেই তাঁরা রবি কর্মকারের দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে শ্মশানঘাটে যান এবং সৎকারের সব ব্যবস্থা করেন।
এরপর মৃত্যুর তেরো দিন পর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানেও তাঁরা সমানভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। শ্রাদ্ধের দিন গ্রামে একদিকে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, অন্যদিকে রবি কর্মকারের বাড়িতে শাঁখ ও উলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে আচার অনুষ্ঠান। দুই ধর্মের এই সহাবস্থান গ্রামবাসীদের মনে বিশেষ আবেগের সৃষ্টি করেছে।
মৃতের ছেলে ষষ্ঠী কর্মকার বলেন, কঠিন সময়ে তাঁদের মুসলিম প্রতিবেশীরাই সব দায়িত্ব নিয়েছেন। বাবার শেষকৃত্য থেকে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত সবকিছুই তাঁরা করেছেন। এই সাহায্যের ঋণ কোনও দিন ভোলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম মৌলানা মিজানুর রহমান বলেন, মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা। গ্রামের যুবকেরা যে কাজ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
গ্রামের মানুষের মতে, ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এই মনোভাবই বাংলার প্রকৃত সংস্কৃতি। থানারপাড়ার এই ঘটনা তাই সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।


