পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আলুর দাম কমতে থাকায় চরম সঙ্কটে পড়েছেন চাষিরা। গত কয়েক দিনের মধ্যে তিনজন আলু চাষির অস্বাভাবিক মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি ও পূর্ব বর্ধমান জেলার এই ঘটনাগুলি গ্রামবাংলার বর্তমান বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিচ্ছে।পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা ১ ব্লকের রাঙামাটি গ্রামের বাসিন্দা ২৮ বছরের রাখাল আড়ি ছিলেন এক প্রান্তিক কৃষক। এ বছর আলু চাষে তিনি প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু বাজারে আলুর দাম হু হু করে কমতে থাকায় তিনি বুঝতে পারেন, ঋণ শোধ করা সম্ভব হবে না। পরিবারের দাবি, এই চাপ সহ্য করতে না পেরে ৬ মার্চ তিনি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১১ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে।একইভাবে হুগলির গগহাট ব্লকের সাহাদেব নন্দীও আলু চাষ করতেন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনিও কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানের কালনা এলাকায় ৭৮ বছরের শৈলেন ঘোষ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হন। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে এই তিনটি মৃত্যু আলুচাষিদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।চাষিদের অভিযোগ, এ বছর আলুর ফলন ভালো হলেও বাজারে ক্রেতা নেই। ১৬ মার্চ বাজারে জনপ্রিয় ‘জ্যোতি’ আলুর দাম নেমে আসে মাত্র ২০০ টাকা প্রতি কুইন্টালে। অথচ চাষের খরচ ছিল অনেক বেশি। ফলে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।রাজ্য সরকার আগে ঘোষণা করেছিল, কৃষকবন্ধু কার্ড থাকা চাষিদের কাছ থেকে ৯৫০ টাকা প্রতি কুইন্টাল দরে আলু কেনা হবে। তবে বাস্তবে সেই ক্রয় প্রক্রিয়া খুব কম জায়গাতেই শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ। অনেক চাষি এখনও পর্যন্ত সরকারকে আলু বিক্রি করতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে ঠান্ডা গুদামে আলু রাখতে হচ্ছে, যেখানে জায়গারও অভাব দেখা দিয়েছে।এদিকে রাঙামাটি গ্রামের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ছোট চাষি। তাদের জমির পরিমাণ খুবই কম, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৪-৫ বিঘার বেশি নয়। অনেকেই ভাগচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রাখাল আড়ির পরিবারেও ছিল একই অবস্থা। নিজের সামান্য জমির পাশাপাশি অন্যের জমি নিয়ে তিনি আলু চাষ করেছিলেন।জানা গিয়েছে, রাঙ্গামাটি গ্রামের রাখালের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তান নিয়ে সংসার চলবে কীভাবে, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের দাবি, চাষের জন্য ধার নেওয়া টাকা ও গয়না বন্ধক রেখে যে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তা সবই এখন ক্ষতিতে ডুবে গেছে।চাষিদের হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ৫০-৬০ কুইন্টাল আলু উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু দাম ২০০ টাকায় নেমে আসায় প্রতি বিঘায় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে ফলে চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।রাজ্যে এ বছর প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টরের বেশি জমিতে আলু চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন রেকর্ড ছুঁয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ঠান্ডা গুদামের পরিকাঠামো অনেক কম। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু মাঠেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে। চাষিদের প্রশ্ন, উৎপাদন এত বেশি হলেও বাজারে দাম কেন নেই। এই অবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ আরও জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
Popular Categories


