দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে অচেতন অবস্থায় জীবন কাটানোর পর অবশেষে ‘স্বেচ্ছা মৃত্যু’র অনুমতি পেলেন উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের যুবক হরিশ রানা। দেশের শীর্ষ আদালত সম্প্রতি তার ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমোদন দিয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর গত শনিবার তাকে গাজিয়াবাদ থেকে দিল্লির এইমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল ধাপে ধাপে তার শরীর থেকে জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
হরিশের বয়স এখন ৩১ বছর। একসময় প্রাণবন্ত ও স্বপ্নভরা জীবন ছিল তার। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সবকিছু বদলে দেয়। ২০১৩ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তিনি মেসের চারতলা থেকে পড়ে যান। সেই দুর্ঘটনায় তার মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগে। চিকিৎসায় তার প্রাণ রক্ষা পেলেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেননি। দুর্ঘটনার পর থেকেই আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রাংশের মাধ্যমে (ভেজিটেটিভ অবস্থায়)তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। নিজের ইচ্ছায় নড়াচড়া করা বা কথা বলার ক্ষমতাও আর ফেরেনি।
এই দীর্ঘ সময় ধরে ছেলের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তার বাবা অশোক রানা। চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং নানা ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের খরচ সামলাতে পরিবারকে বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে রাখতে তার গলায় ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব লাগানো ছিল। খাবার দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হত বিশেষ ফিডিং টিউব। এই অবস্থাতেই বছরের পর বছর কেটে গেছে।
হরিশের পরিবার জানায়, গত কয়েক বছরে তার স্বাস্থ্যের কোনও উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকরাও আশা দেখাতে পারেননি। একই সঙ্গে বাবা-মায়েরও বয়স বাড়ছে। ভবিষ্যতে তারা না থাকলে ছেলের দেখাশোনা কে করবে, সেই দুশ্চিন্তাই তাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই আদালতের দ্বারস্থ হন তারা এবং ছেলের জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি চান। সুপ্রিম কোর্ট চিকিৎসকদের মতামত এবং মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট পর্যালোচনা করার পর প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী এখন চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা সরানো হবে।
এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে একটি আবেগঘন ভিডিও সামনে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, গাজিয়াবাদে বাড়ি থেকে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার আগে পরিবারের সদস্যরা চোখের জলে হরিশকে বিদায় জানাচ্ছেন। তার মা ছেলের পাশে বসে আছেন। পরিবারের সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। একজন আধ্যাত্মিক সংগঠনের সদস্যকে দেখা যাচ্ছে হরিশের কপালে তিলক পরিয়ে বলছেন, ‘যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে তবে সে যেন সবাইকে ক্ষমা করে দেয়।’ দীর্ঘদিনের এই সংগ্রাম এবং শেষ সিদ্ধান্ত অনেকের মনকেই ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। হরিশের প্রতিবেশীরাও জানিয়েছেন, এত বছর ধরে একটি পরিবার কীভাবে অসীম ধৈর্য নিয়ে ছেলের পাশে থেকেছে, তা দেখলে যে কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়বেন বলে মনে করছেন অনেকেই।


