উত্তরাখণ্ডের হলদোয়ানি শহরের বনফুলপুর এলাকায় প্রায় ২১ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে একটি বড় বসতি। বহু বছর ধরে এখানে প্রায় ৪৩৬০টি পরিবার বসবাস করছে। মোট মানুষের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি। হলদোয়ানি রেলস্টেশনের পাশের এই এলাকায় কয়েক দশক ধরে মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়ে জীবন গড়ে তুলেছেন। এই অঞ্চলে রয়েছে মসজিদ, মন্দির, দুটি ইন্টার কলেজ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নিকাশির সুবিধাও।
২০২৪ সালে হঠাৎ করে এই জমি খালি করার নির্দেশ আসে। দাবি করা হয়, জমিটি রেলের মালিকানাধীন এবং সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে নোটিশ পাঠিয়ে জায়গাটি দখলমুক্ত করার কথা বলা হয়। এই ঘোষণার পরই এলাকায় চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষজন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, শীতের সময় উচ্ছেদ হলে হাজার হাজার মানুষ এক মুহূর্তে গৃহহীন হয়ে পড়বেন। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে, পরিবারগুলোর জীবিকা সংকটে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি আদালতে পৌঁছায়। কয়েকজন বাসিন্দার পক্ষে মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে আইনি সহায়তা দেয় জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ। পরে মামলাটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট-এ ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ শুনানির পর আদালত জানায়, পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কোনও ভাঙচুর বা উচ্ছেদ করা যাবে না।
আদালত স্পষ্টভাবে বলে, জমির মালিকানা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রেলের থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষের অধিকার ও মর্যাদাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়, প্রকৃতভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পুনর্বাসনের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত কোনও পরিবারকে সরানো যাবে না বলেও জানানো হয়েছে।
এছাড়া জেলা প্রশাসনকে বিশেষ নিবন্ধন শিবির খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে যোগ্য পরিবারগুলোর নাম নথিভুক্ত করা যায়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষদের কেন্দ্রীয় আবাসন প্রকল্পের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে বিকল্প বাসস্থানের জন্য আবেদন করতেও সহায়তা দেওয়া হবে। রমজান ও ঈদের সময় বিবেচনায় রেখে শিবির আয়োজনের তারিখ নির্ধারণের কথাও আদালত উল্লেখ করেছে, যাতে মানুষের অসুবিধা কম হয়।
সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ মাদানি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আইন শুধু কাগজে-কলমে মালিকানা নয়, মানুষের সম্মান ও অধিকারও রক্ষা করবে—এই বার্তাই দিয়েছে আদালত। সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হাকিমুদ্দিন কাসেমি জানান, যাতে কোনও যোগ্য পরিবার বাদ না পড়ে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সাহায্য করছেন।
এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাঁদের বক্তব্য, বহু বছর ধরে এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন তাঁরা। তাই হঠাৎ উচ্ছেদ হলে শুধু ঘর নয়, একটি গড়ে ওঠা সমাজ ভেঙে যাবে। দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্ছেদ অভিযানের মুখে দাঁড়িয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ আপাতত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। এখন সকলের নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার দিকে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকলেই এই জটিল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


