গাজায় চলমান ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্মম গণহত্যার তদন্তে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবেনিজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার উপর এক মারাত্মক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে একটি সত্য উন্মোচিত হয়েছে, যা ইসরায়েলের দখল ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার অর্থনৈতিক দিকগুলোকে সামনে এনেছে। তিনি তার প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন কীভাবে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থা এবং পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের পিছনে লাভের হিসেবে জড়িয়ে আছে। এই সাহসী প্রতিবেদনের জন্য মার্কিন সরকার তাকে নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেলেছে, যা কেবল সত্যকে দাবিয়ে রাখার একটি হীন প্রচেষ্টা। কিন্তু বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা, যাদের মধ্যে রয়েছেন থমাস পিকেটি, ইয়ানিস ভারুফাকিস এবং জয়তি ঘোষ, আলবানেসের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা বলছেন, এই গণহত্যার বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হওয়া দরকার, কারণ কয়েক বছর পর সবাই দাবি করবে তারা এর বিরোধী ছিল, কিন্তু এখনই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রকৃষ্ট সময়।
আলবানেসের প্রতিবেদনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, যা অর্থনীতিবিদরা জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। প্রথমত, ইসরায়েলের দখল ও গণহত্যা কর্পোরেট জগতের জন্য একটি সোনার খনি। লকহিড-মার্টিন, এলবিট সিস্টেমস এবং প্যালান্টিরের মতো কোম্পানি অস্ত্র তৈরি ও টার্গেট নির্বাচনের প্রযুক্তি দিয়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে শক্তিশালী করছে। এই কোম্পানিগুলোর লাভের হিসেবে ফিলিস্তিনিদের রক্ত ঝরছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট যখন দ্বিগুণ হয়েছে, তখন এই সংস্থাগুলোর বিনিয়োগও বেড়েছে। তেল আবিবের শেয়ার বাজারে ১৬১% বৃদ্ধি এবং বিশাল আর্থিক লাভ এর জ্বলজ্বল প্রমাণ। এই অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ইসরায়েলের গাজা দখল ও পৈশাচিক গণহত্যা।
দ্বিতীয়ত, দখলকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, আলফাবেট এবং প্যালান্টিরের মতো প্রতিষ্ঠান তাদের ক্লাউড সেবা ও প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের ওপর পরীক্ষা করছে। মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, টার্গেট নির্বাচনের অ্যালগরিদম এবং স্বয়ংক্রিয় হত্যা ব্যবস্থা রিয়েল টাইমে চালানো হচ্ছে, যা মানবিক নৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এই কোম্পানিগুলো ফিলিস্তিনিদের জীবনকে বিপন্ন করে তাদের প্রযুক্তি উন্নত করছে, যা মানবতার জন্য একটি কলঙ্ক।
তৃতীয়ত, শীর্ষস্থানীয় আমেরিকান ও ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসরায়েলের এই রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে আর্থিকভাবে সম্পর্কিত। মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, এমআইটি ল্যাবস এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ইসরায়েলি দখলদারি ও নৃশংস গণহত্যাকে সমর্থন না করলে আর্থিক সংকটে পড়বে, এমন হুমকিমার্কিন সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্রছাত্রীদের মুক্ত চিন্তার এমন বলপূর্বক হস্তক্ষেপ বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।
এছাড়াও, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আইসিসি’র গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সত্ত্বেও ইতালি, ফ্রান্স এবং গ্রিস তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, যা আলবানেস তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে ইসরায়েল ও মার্কিন সরকার গণহত্যার দায় এড়াতে সব সম্ভব করছে।
অর্থনীতিবিদরা আলবানেসের প্রতিবেদনকে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং জাতিসংঘকে এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এই গণহত্যার বিরুদ্ধে এখনই দাঁড়াতে হবে। ইসরায়েল ও মার্কিন সরকারের এই কর্মকাণ্ড শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, পুরো মানবজাতির জন্য বিপদসংকেত। এই অবিচার দ্রুত বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক স্তরে সমস্ত দেশগুলিকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।


