গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর থেকেই বাংলায় এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আবহ তৈরি করেছে বিজেপি পরিচালিত নতুন সরকার। রাজ্যজুড়ে ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলা’ গড়ার বুলি আউড়ে আসলে বিরোধী শূন্য করার খেলায় মেতেছে শাসকদল। শুরু থেকেই স্বশাসিত পুলিশ ও দিল্লির নির্দেশে চলা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিরোধী শিবিরের পেছনে। প্রাক্তন মন্ত্রী থেকে শুরু করে ব্লক স্তরের সাধারণ কর্মী— রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন সকলেই। নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১১ দিনের মাথায় বেছে বেছে বিরোধী শিবিরের মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার বা আটক করে পেশীশক্তি প্রদর্শনের মরিয়া চেষ্টা চলছে।
এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক অভিযানের প্রথম বড় কোপ পড়ে গত ১১ মে। রাজ্যের জনপ্রিয় নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেনস্থা করে গ্রেপ্তার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে ইডি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এর ঠিক দুদিন পর, ১৩ মে বহরমপুরের কাউন্সিলর শান্তনু মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিনে সিবিআইকে ব্যবহার করে নিয়োগ দুর্নীতির নামে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করানো হয়, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো বিরোধী দলগুলোর মনোবল ভেঙে দেওয়া।
এরপর ১৪ মে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় প্রাক্তন ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে। আইনি লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও ক্ষমতার জোরে তাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ জারি করে কার্যত হেনস্থা করা হয় এবং শেষে ম্যারাথন জেরার নামে গ্রেপ্তার করা হয়। এখানেই শেষ নয়, গত ১৭ মে এক ধাক্কায় ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ক্ষমতার দম্ভ দেখায় প্রশাসন। তোলাবাজির মনগড়া অভিযোগে নদিয়ার পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ স্মরজিৎ বিশ্বাস এবং দিনহাটার প্রাক্তন পুরপ্রধান গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরী ও পুরকর্মী মৌমিতা ভট্টাচার্যকে বিল্ডিং প্ল্যানের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে আরও দুজনকে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে জালে পোরা হয়।
গত ১৮ মে, সোমবার সিজিও কমপ্লেক্সে সস্ত্রীক হাজিরা দিতে গেলে গ্রেপ্তার করা হয় বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুকে। একই দিনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তোলাবাজির মামলা সাজিয়ে আসানসোলের ব্লক সভাপতি রাজু অহলুওয়ালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, ১৯ মে মঙ্গলবার রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন বিধায়কের স্বামী তথা যুবনেতা দেবরাজ চক্রবর্তীকে আটক করেছে পুলিশ। ভোট পরবর্তী হিংসার পুরনো অভিযোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে খাড়া করে তাঁর ওপর এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, ক্ষমতা দখলের মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই যেভাবে ইডি-সিবিআই এবং পুলিশকে বিরোধীদের দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে উন্নয়ন নয়, বরং বাংলায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাই এই নতুন সরকারের একমাত্র লক্ষ্য।


