পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ এবং জাতিগত শংসাপত্র ঘিরে ফের বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সামনে এল। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ওবিসি তালিকা ও সংরক্ষণ নীতি নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছিল। এবার সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এতদিন চালু থাকা ওবিসি সংরক্ষণের কাঠামো নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে।
এর পরদিনই অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ দফতর নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়েছে, ২০১০ সালের আগের নিয়ম মেনেই নতুন ওবিসি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মোট ৬৬টি সম্প্রদায়কে এই তালিকায় রাখা হয়েছে এবং তাঁদের জন্য ৭ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মঙ্গলবার এই তালিকা সমস্ত জেলার প্রশাসনের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।
নতুন তালিকায় কুরমি, নাই বা নাপিত, তাঁতি, ধানুক, কাসাই, তুরহা, খানদাইত, পাহাড়িয়া মুসলিম, দেবাঙ্গ, মুসলিম হাজ্জাম-সহ একাধিক সম্প্রদায়ের নাম রয়েছে। এছাড়াও যাঁরা তপশিলি জাতিভুক্ত হয়েও পরে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তাঁদেরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১১ সালের পর পূর্বতন সরকারের আমলে যেসব ওবিসি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেগুলির বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নয়া নির্দেশিকার ফলে ওই সময়ের বহু সার্টিফিকেট বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। এই সিদ্ধান্তে চাকরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আসলে এই বিতর্কের সূত্রপাত বহু আগেই। বাম সরকারের শেষ দিকে এবং পরে তৃণমূল সরকারের শুরুতে মোট ৭৭টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ২২ মে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ধর্মের ভিত্তিতে কিছু সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় রাখা হয়েছিল, যা আইনসম্মত নয়।
হাইকোর্টের সেই রায়ের জেরে প্রায় পাঁচ লক্ষ ওবিসি শংসাপত্রের বৈধতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের মতো পরীক্ষার মেধাতালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও। পরে তৎকালীন রাজ্য সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায় এবং স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করে।
আগের ব্যবস্থায় ওবিসি সম্প্রদায়কে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল— ওবিসি ‘এ’ এবং ওবিসি ‘বি’। সেখানে এক শ্রেণির জন্য ১০ শতাংশ এবং অন্য শ্রেণির জন্য ৭ শতাংশ সংরক্ষণের নিয়ম ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই বিভাজন পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে একক তালিকার ভিত্তিতেই সংরক্ষণ কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই নতুন সিদ্ধান্ত ঘিরেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিভিন্ন মহলের দাবি, নতুন তালিকাতেও কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। কারণ, বিষয়টি এখনও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। ফলে ভবিষ্যতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আবারও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, রাজ্যের নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠন এখন খতিয়ে দেখছে, ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি শ্রেণিবিভাগ তুলে দেওয়ার ফলে কোন কোন সম্প্রদায়ের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে।


