রান্নার গ্যাসের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। মূল্যবৃদ্ধির চাপে নাজেহাল সাধারণ মানুষের সামনে এবার নতুন উদ্বেগ—স্মার্ট মিটার চালুর ফলে কি বিদ্যুতের খরচ আরও বাড়বে? রাজ্যজুড়ে প্রায় ২ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সম্প্রতি কলকাতা সফরে এসে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর জানান, আগামী জুলাই মাস থেকেই দ্রুতগতিতে স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ শুরু হবে। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা বাড়তে শুরু করেছে। কারণ, অতীতে রাজ্যের কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্ট মিটার চালুর অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছিল।
উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। সেই সময় বহু গ্রাহক অভিযোগ করেন, আগের তুলনায় তাঁদের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্ষোভও দেখা দেয় বিভিন্ন এলাকায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তৎকালীন রাজ্য সরকারকে সেই প্রকল্প থেকে কার্যত পিছিয়ে আসতে হয়েছিল।
স্মার্ট মিটার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের অন্যতম কারণ এর খরচ। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি স্মার্ট মিটারের জন্য গ্রাহকদের মাসে ১০০ টাকা করে ভাড়া দিতে হবে, যা ৯১ মাস পর্যন্ত চলবে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সংগঠন অল বেঙ্গল ইলেক্ট্রিসিটি কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন (অ্যাবেকা)-র দাবি, বর্তমানে ব্যবহৃত ডিজিটাল মিটারের মাসিক ভাড়া প্রায় ১০ টাকা এবং সেই মিটার প্রায় ২৫ বছর ব্যবহার করা যায়। তুলনায় স্মার্ট মিটারের আয়ু আট থেকে নয় বছরের বেশি নয় বলে দাবি সংগঠনের।
অ্যাবেকার সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বিশ্বাসের মতে, স্মার্ট মিটার চালুর সঙ্গে ‘টাইম অফ ডে ট্যারিফ’ বা সময়ভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে যে সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকবে, সেই সময়ে বেশি মাশুল গুনতে হতে পারে গ্রাহকদের। তাঁর আশঙ্কা, শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের বিদ্যুৎ চাহিদার চাপের প্রভাব সাধারণ গৃহস্থ গ্রাহকদের উপরও পড়তে পারে।
এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারী স্মার্ট মিটার প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক নয় এবং গ্রাহকের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, স্মার্ট মিটার চালু হলে সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব নীতির ফারাক নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, সরকার ইতিমধ্যেই সরকারি কর্মীদের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। পাশাপাশি ২ কোটি গ্রাহকের জন্য স্মার্ট মিটার বসানোর লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভবিষ্যতে এই স্মার্ট মিটারগুলি কি প্রিপেইড হবে, নাকি পোস্টপেইড ব্যবস্থাই বহাল থাকবে? কেন্দ্রীয় স্তরে অতীতে বলা হয়েছিল প্রিপেইড স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপে সব স্মার্ট মিটারকে প্রিপেইড করার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ধন্দ ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। স্মার্ট মিটার কি বিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও আধুনিক সুবিধা আনবে, নাকি বাড়তি খরচের নতুন বোঝা চাপাবে—সেই উত্তরই এখন খুঁজছেন বাংলার কোটি কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক।


