সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এবং রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কলকাতার রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। যে কলকাতা চিরকাল তৃণমূলের খাসতালুক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও এবার বিধানসভার ১১টি আসনের মধ্যে ৬টিই দখল করেছে বিজেপি। এই ফলের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকাতা পুরসভাতেও, কারণ শহরের ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০২টিতেই এবার এগিয়ে রয়েছে বিজেপি প্রার্থীরা। খাতায়-কলমে পুরসভা এখনও তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, একের পর এক নজিরবিহীন ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে পুর প্রশাসনের রাশ আলগা হচ্ছে। মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের পক্ষ থেকে ভাঙার নোটিস পাঠানো এবং সাংসদ মালা রায় ও তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা দায়ের করার মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, ক্ষুব্ধ ফিরহাদ হাকিম মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দিতে চেয়েছেন এবং সেই ইচ্ছা ইতিমধ্যেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দলের অন্দরে বড়সড় ভাঙন ও ডামাডোল রুখতে শুক্রবার বিকেল ৪টেয় কালীঘাটের বাসভবনে দলীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
এই রাজনৈতিক সংকটের জেরে শুক্রবার পুরসভায় নির্ধারিত অধিবেশনটি বৃহস্পতিবার রাতেই এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কালীঘাটের এই জরুরি বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় তৃণমূলের ১৩৭ জন কাউন্সিলর থাকলেও, এবারের নির্বাচনে তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়েছেন। রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন হতেই গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং পুলিশ-প্রশাসনকে হাতিয়ার করে বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের কোণঠাসা করার মরিয়া চেষ্টা চলছে, তাতে কাউন্সিলরদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মেয়রের ইস্তফা দেওয়ার জল্পনা এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী ডিসেম্বর মাসে কলকাতা পুরসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা এবং তখনই নির্বাচন হওয়ার নিয়ম। তবে প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, নতুন রাজ্য সরকার চাইলে এই নির্বাচন এগিয়ে আনতে পারে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিরহাদ হাকিম যদি সত্যিই মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেন, তবে নতুন বিজেপি সরকার পুরসভায় কোনো প্রশাসক না বসিয়ে তৃণমূলের এই দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিতে চাইবে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এবং কলকাতা পুরসভা পুরোপুরি দখল করতে বিজেপি সরকার মেয়াদের আগেই পুরভোটের পথে হাঁটতে পারে বলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রের স্বৈরাচারী নীতির আদলে রাজ্যেও যেভাবে ক্ষমতার রাশ টেনে বিরোধী দলগুলোকে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে, পুরসভার এই ঘটনাকে তারই অংশ হিসেবে দেখছে অভিজ্ঞ মহল।


