অবরোধের ফাঁদে বন্দি গাজা আজ এক নিঃশ্বাসরুদ্ধ জনপদের নাম। সেখানে শুধু গোলাগুলি আর ধ্বংস নয়, আরও নীরব অথচ গভীর এক সংকট দিনকে দিন মারাত্মক হয়ে উঠছে—খাদ্য ও পানির চরম সংকট। এই পরিস্থিতিতে ফের কড়া ভাষায় আন্তর্জাতিক সমাজের ভূমিকার সমালোচনা করল ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। তাদের ভাষায়, গাজাবাসীদের জীবন আজ যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার এক পরিকল্পিত চিত্র, যার নেপথ্যে রয়েছে ইজরায়েলের যুদ্ধনীতি এবং বিশ্বের নীরব সমর্থন।
টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হামাস অভিযোগ করেছে, গত কয়েক মাস ধরে গাজার নাগরিকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে না খেতে ও না খেতে দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা একে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশল নয়, বরং একটি সচেতন গণহত্যার রূপ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই এই দুর্দশা থেকে রেহাই পাচ্ছে না, অথচ যারা নিজেদের মানবাধিকারের রক্ষক বলে দাবি করে, সেই রাষ্ট্রগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছে।

বিশ্বের পশ্চিমা শক্তিগুলোর উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়ে হামাস জানিয়েছে, শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সারা চলবে না। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের কাছে আহ্বান জানিয়েছে—ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে, অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করতে এবং এই অবরোধকে আর প্রশ্রয় না দিতে।
মানবিক সহায়তার প্রবেশের প্রশ্নে জাতিসংঘের দায়িত্ব সম্পর্কেও হামাস স্পষ্ট মত দিয়েছে। তাদের দাবি, এখন আর সময় নেই আলোচনার; জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে খাদ্য, ওষুধ এবং বিশুদ্ধ পানি কোনও শর্ত ছাড়াই গাজায় পৌঁছায়। কারণ প্রতিদিনই কেউ না কেউ প্রাণ হারাচ্ছে ক্ষুধা বা তৃষ্ণার যন্ত্রণায়।

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত একদিনেই আরও দুইজন প্রাণ হারিয়েছে অপুষ্টি ও অনাহারে। এই নিয়ে চলমান দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১১৩ জনে। বাস্তব পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ, তা অনেকে আঁচ করতে পারলেও, নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছাচ্ছে না বাইরের দুনিয়ায়।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি নিছক এক অঞ্চলের সংকট নয়—বরং বৈশ্বিক মানবিক নীতির একটি কঠিন পরীক্ষা। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার মানবতার কথা বলে, তখন গাজা যেন সেই কথার বাস্তবতা যাচাইয়ের এক নির্মম মঞ্চ।

আজকের গাজা শুধু ধ্বংসস্তূপ নয়, এটি এক কষ্টসাধ্য প্রতিরোধের নাম। প্রতিদিন ক্ষুধা, পিপাসা, বোমা এবং নিঃস্বতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মুখের নাম। তাদের এই আত্মসংঘামের আহ্বানে যদি বিশ্ব এখনও সাড়া না দেয়, তবে তা ইতিহাসের পাতায় শুধুই আরেকটি নিষ্ঠুর অধ্যায় হয়ে থাকবে।


