“জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখো হিসেবে-নিকেশ, কিছুই রবে না!” মান্না দের কণ্ঠে কালজয়ী এই গানটি সাধারণ মানুষকে বোঝাতে মরিয়া বিজেপি সরকার। দেশের কর্পোরেট ক্ষেত্রকে বড় অঙ্কের কর সুবিধা দেওয়ার পরেও শিল্পে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বরং গত অক্টোবরে শিল্পোৎপাদনের বৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় খুবই কম। অর্থনৈতিক মহলের মতে, কর কমানো এবং বিপুল ঋণ মকুবের পরেও বাজারে চাহিদা না থাকায় নতুন প্রকল্পে অর্থ ঢালতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বড় সংস্থাগুলি। সম্প্রতি সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরি গত আট বছরের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত কর্পোরেট কর কমানোর ফলে সরকারের আয়ে বড়সড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শুধু ২০১৬-১৭ সালেই কর কমানোর কারণে রাজস্ব কমেছে ৮৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। পরের বছরগুলোতেও একই ধারা বজায় থেকেছে। ২০১৭-১৮ সালে আয় কমেছে প্রায় ৯৬ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ সালে ১ লক্ষ ৮ হাজার কোটিরও বেশি, ২০১৯-২০ সালে ৯৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে ৭৫ হাজার ২১৮ কোটি, ৯৬ হাজার ৮৯২ কোটি, ৮৮ হাজার ১০৯ কোটি এবং ৯৮ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার মতো রাজস্ব হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে আট বছরে মোট ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৭ লক্ষ ৯১ হাজার কোটিরও বেশি।
সরকার ২০১৫-১৬ সালে কর্পোরেট করের হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামায়। পরে ধাপে ধাপে আরও হ্রাস করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল শিল্পে নতুন বিনিয়োগ টানা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো। কিন্তু শিল্প মন্ত্রকের সূত্রে জানা যায়, কর ছাড়ের হার যত বেড়েছে, বিনিয়োগ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে প্রত্যাশিত শিল্পায়নও হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪-১৫ সালে প্রত্যক্ষ কর হিসেবে কর্পোরেট করের অংশ ছিল ৬১.৬৫ শতাংশ। পরবর্তী দশ বছরে এই হার ক্রমশ কমে ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক দশকে প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে বড় বড় সংস্থার লাভের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। কেন্দ্রীয় সূত্রের দাবি, গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে মুনাফা বৃদ্ধি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। বর্তমানে কর্পোরেট মুনাফা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪.৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে মুনাফা বাড়লেও নতুন কারখানা বা প্রকল্পে বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান তেমন বাড়েনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম থাকায় বাজারে চাহিদা তৈরি হয়নি। ফলে বড় সংস্থাগুলি উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ পাচ্ছে না। এদিকে গত দশ বছরে কর ছাড়ের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ঋণও মকুব করা হয়েছে। বিভিন্ন বছরে বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ বাতিল হয়েছে। একইভাবে প্রযুক্তি পরিষেবা ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ মকুব হয়েছে। সব মিলিয়ে বড় শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে মোট ঋণ মকুবের পরিমাণ ১০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। সমালোচকদের মতে, এত বড় আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরেও যদি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সরকার অবশ্য দাবি করছে, দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল মিলবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পে স্থবিরতা এবং সীমিত কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


