ভারী বর্ষণের জেরে জম্মু-কাশ্মীরে জলস্তর বাড়তে থাকায় চেনাব নদীর বাগলিহার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের গেট খুলে দিয়েছে ভারত। একইসঙ্গে খোলা হয়েছে সালাল জলাধারের গেটও। এ পরিস্থিতির ফলে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চেনাব নদী সিন্ধু জলচুক্তির অন্তর্গত এবং পাকিস্তানের কৃষিনির্ভর অঞ্চলের অন্যতম প্রধান জলস্রোত।

জম্মু-কাশ্মীরের রামবানে অবস্থিত বাগলিহার বাঁধের দুটি গেট বৃহস্পতিবার খুলে দেওয়া হয়। প্রবল বর্ষণের ফলে নদীতে জলের পরিমাণ বিপুল হারে বেড়ে গিয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। পাকিস্তানে ৮০ শতাংশের বেশি কৃষিকাজ সিন্ধু নদীর উপর নির্ভরশীল। করাচি, লাহোর, মুলতানের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানও সরাসরি এই জলের উপর নির্ভর করে। ফলে ভারতীয় ভূখণ্ডে বাঁধের গেট খোলা হলে তার প্রভাব পাকিস্তানে মারাত্মকভাবে পড়তে পারে।

সিন্ধু জলচুক্তি অনুযায়ী, ভারত ইরাবতী, শতদ্রু এবং বিপাশা নদীর উপর অধিকার বজায় রাখে, অপরদিকে পাকিস্তানের অধিকার সিন্ধু, ঝিলম এবং চেনাব নদীর উপর। চুক্তি অনুযায়ী, পাকিস্তানের অধীনস্থ নদীগুলিতে ভারত পানি ব্যবহার করতে পারে বটে, তবে সাধারণত কোনও নতুন প্রকল্প বা নির্মাণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে চুক্তিনির্ধারিত শর্ত মানতে হয়। যদিও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু শর্তসাপেক্ষ ছাড় আছে, সেখানে প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং অবস্থান সম্পর্কে পাকিস্তানকে মতামত জানানোর সুযোগও দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলে এসেছে। ভারতের অভিযোগ, রাজনৈতিক বৈরিতার কারণেই পাকিস্তান বারবার উন্নয়নমূলক জলপ্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করে।

সালাল, টুলবুল এবং কিষেণগঙ্গার মতো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরেও বিতর্ক লেগেই রয়েছে। এই নদীগুলি অধিকাংশই বিতর্কিত কাশ্মীর উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে, পহেলগাঁওয়ে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়াও বেশ দৃঢ়। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যের পর কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় বায়ুসেনাকে সীমান্ত এলাকায় ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দিয়েছে। আকাশপথে কোনও সন্দেহজনক বস্তু নজরে এলেই তা প্রতিহত করতে প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। পহেলগাঁও হামলার পর থেকে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পাকিস্তানের তরফে লাগাতার গোলাগুলির অভিযোগ উঠেছে। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র বিশেষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এই সব ঘটনার পটভূমিতে স্পষ্ট, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় বাঁধ খুলতে বাধ্য হচ্ছে ভারত, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। সিন্ধু চুক্তির বাস্তবায়ন এবং নদীগুলির জলপ্রবাহ ঘিরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি যেন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।


