যুদ্ধে নৈতিকতার সমস্ত সীমা পার করলো ইসরায়েল। গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের আতর্কিত হামলায় কেঁপে উঠল গোটা বিশ্ব। ইসরায়েলের রক্তপিপাসু, যুদ্ধংদেহী মানসিকতাকে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রিয় দেশগুলি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি জানায় যে কাতার একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েল, হামাস, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দলের আলোচনাক্ষেত্র ছিল। এর পূর্বে যুদ্ধবিরতি, বন্দীমুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা কাতারেই মুখোমুখি সেরেছিল ইজরায়েল ও হামাস। কিন্তু মঙ্গলবার এখানেই রাজধানী দোহা -কে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায় ইসরাইল। হামলার লক্ষ্য ছিল হামাসের শীর্ষ নেতারা, যারা কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন।
বিশ্বব্যাপী এই হামলাকে ঘিরে সোরগোল সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলকে দ্বিপাক্ষিক সমর্থন স্থগিত রাখার প্রস্তাব করবে। অপরদিকে দোহায় হামাস নেতাদের উপর ইসরায়েলের হামলা বর্বরোচিত হামলাকে “মর্মান্তিক” বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ইসরায়েলের এই হামলা, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি দেশের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় করার প্রতিশ্রুতিকে বিঘ্নিত করেছে ইসরায়েল। আরবের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, নেতানিয়াহু-কে কাপুরুষ বলে অভিহিত করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই বিমান হামলাকে কাতারের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার “স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছেন। তুর্কির তরফ থেকে বলা হয়, “এই পরিস্থিতি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে ইসরায়েল এই অঞ্চলে তার সম্প্রসারণবাদী রাজনীতি এবং সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।” জর্ডনের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয় ইসরায়েলি বোমা হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। হুথি সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের প্রধান মাহদী আল-মাশাত বলেছেন, খুব দেরি হওয়ার আগেই আরব ও মুসলিম দেশগুলিকে ইসরায়েলের পরিকল্পনার প্রতি “মনোযোগ দিতে” হবে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলার দায় স্বীকার করে বলেন, “হামাস নেতাদের হত্যা করতেই এই অভিযান।” ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, এটি ছিল “একটি নিখুঁত আক্রমণ” এবং তাদের লক্ষ্য ছিল হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে হামাস জানায়, দোহার আলোচনায় অংশগ্রহণকারী তাদের শীর্ষ নেতারা সকলেই নিরাপদে আছেন। এখনও নিশ্চিত নয়, ইসরাইল আদৌ তাদের লক্ষ্য পূরণে সফল হয়েছে কিনা। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এই হামলা নিয়ে তীব্র নিন্দা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে এমন হামলা চালানো কি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন নয়?
এর আগে ইরানে হামলা চালিয়ে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ-সহ তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লেবাননে হত্যার শিকার হয়েছেন হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার। এই ধারাবাহিক হত্যা ও প্রকাশ্য হামলা ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবকেই সামনে এনে দিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মত বিশ্লেষকদের।


