
সকালের শিশিরভেজা শ্রীহরিকোটার আকাশে যখন সূর্যের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি ব্যর্থতার অধ্যায়। গত রবিবার ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে PSLV-C61 রকেটে করে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল EOS-09 স্যাটেলাইটটি। উৎক্ষেপণের প্রথম কয়েক মিনিট সব ঠিকঠাক চলছিল। রকেটের ইঞ্জিনের গর্জন, পিছনে দৃশ্যমান আগুনের লেলিহান শিখা – সবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু উৎক্ষেপণের মাত্র ২০৩ সেকেন্ড পরই ঘটে যায় বিপত্তি। তৃতীয় স্টেজে সমস্যা দেখা দেয় এবং মাঝ আকাশেই ধ্বংস হয়ে যায় স্যাটেলাইটটি।
এই ঘটনায় ISRO-র বিজ্ঞানীদের মুখে দেখা গেছে গভীর হতাশা। কেননা EOS-09 ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট। এর বিশেষত্ব ছিল এর ২৪ ঘণ্টা নজরদারির সক্ষমতা। স্যাটেলাইটটিতে এমন প্রযুক্তি ছিল যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে উচ্চমানের ছবি তোলা সম্ভব ছিল। শুধু তাই নয়, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্বাভাস থেকে শুরু করে সামরিক নজরদারিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। ১৬৯৬ কেজি ওজনের এই স্যাটেলাইটটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা।
ISRO-র চেয়ারম্যান ড. এস. সোমনাথ ব্যর্থতার কারণ হিসেবে PSLV রকেটের তৃতীয় স্টেজে প্রপেল্যান্ট সিস্টেমে সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, প্রথম দুটি স্টেজ সম্পূর্ণ সফলভাবে কাজ করলেও তৃতীয় স্টেজে ব্যবহৃত হাইড্রক্সিল টার্মিনেটেড পলিবুটাডিন (HTPB) প্রপেল্যান্টে অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়। ফলে স্যাটেলাইটটি ১১৫ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছানোর আগেই বিধ্বস্ত হয়।
এই ব্যর্থতা ভারতের জন্য কতটা বড় ধাক্কা তা বোঝাতে গেলে বলতে হয়, বর্তমানে ভারতের নিরাপত্তা ও নজরদারি কাজের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইটের উপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও চীন সীমান্তে কার্যকর নজরদারির জন্য EOS-09 ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো।
রকেটের উৎক্ষেপণ দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা রমেশ বাবু বলেন, “আমরা অনেক আশা নিয়ে এখানে এসেছিলাম। রাত তিনটেয় উঠে লাইভ দেখতে বসেছিলাম। যখন দেখলাম রকেটের আলো আকাশে লাল হয়ে উঠছে, তখনই বুঝে গিয়েছিলাম কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।”
এদিকে মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. অরুণাচালম বলেন, “মহাকাশ অভিযানে ব্যর্থতা আসতেই পারে। ISRO-র ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে তারা শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে।”

ISRO এখন জরুরি বৈঠক করেছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে। আগামী অক্টোবরে GSLV Mk-III রকেট দিয়ে NISAR স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। ২০১৭ থেকে এখন পর্যন্ত PSLV রকেট দিয়ে মোট ৬৩টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, যার মধ্যে এটিই তৃতীয় সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।
১৯৯৩ সালে PSLV-এর প্রথম উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল। ২০১৭ সালে IRNSS-1H স্যাটেলাইট হিটল হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এবারের ব্যর্থতা ISRO-র প্রযুক্তি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদারকী কিছু প্রশ্ন উঠছে বটে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধাক্কা কাটিয়ে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি আবারও নতুন গতিতে এগিয়ে চলবে।


