রাজ্যের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় ভরাডুবির পর এবার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ ও ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এল। দলে চার দশকের আনুগত্যের বদলে অপমানিত হওয়ার অভিযোগ তুলে এবার তৃণমূলের বারাসত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠানোর পাশাপাশি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কোনো ভুঁইফোঁড় বহিরাগত কর্পোরেট সংস্থার ওপর ভরসা না করে দলের পুরনো ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের মর্যাদা দেওয়ার জন্য তিনি শীর্ষ নেতৃত্বকে অনুরোধ করেছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, একদিকে বিরোধী দল বিজেপির উগ্র মেরুকরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার, আর অন্যদিকে শাসকদলের সীমাহীন দুর্নীতি ও নিজেদের ভেতরের কাজিয়া— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
এই সংকটের সূত্রপাত গত ১৪ মে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা দলীয় সাংসদদের একটি জরুরি বৈঠককে কেন্দ্র করে। ওই বৈঠকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে সরিয়ে শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই ঘটনার পরদিনই ক্ষোভ উগরে দিয়ে সমাজমাধ্যমে বারাসতের সাংসদ লিখেছিলেন যে, ১৯৭৬ সাল থেকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং ১৯৮৪ সাল থেকে দলের সাথে পথ চলা শুরু হলেও, চার দশকের অন্ধ আনুগত্যের জন্য অবশেষে তাঁকে এইভাবেই পুরস্কৃত হতে হলো। সেই ফেসবুক পোস্টের ঠিক নয় দিনের মাথায় এবার সরাসরি জেলা সভাপতির পদই ত্যাগ করলেন তিনি। চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন যে, কোনো ভুঁইফোঁড় এজেন্সির চাটুকারিতা করে কঠিন রাজনৈতিক লড়াই জেতা সম্ভব নয়, বরং পুরনো কর্মীদের গুরুত্ব দিলেই দলের ক্ষয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার হতে পারে। ঘটনাচক্রে, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে তৃণমূল যে পেশাদার সংস্থা আইপ্যাক-এর পরামর্শে দল পরিচালনা করছিল, হারের পর সেই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরেই এখন বিদ্রোহ শুরু হয়েছে।
দলীয় পদের মোহ ত্যাগ করে রাজ্য সভাপতিকে পাঠানো চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং তৃণমূল সরকারের আমলে ঘটে চলা একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়েও সরব হয়েছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক অপরাধ এবং দুর্নীতির উদ্বেগজনক ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনীতিতে যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মূল্যবোধের প্রয়োজন ছিল, বর্তমান শাসকদল তা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নিজের সংসদীয় এলাকায় দলের এই করুণ ফলাফলের নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই ঘটনা আসলে গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে কেন্দ্রের জনবিরোধী নীতি ও রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপির নোংরা রাজনীতি, আর অন্যদিকে রাজ্যের শাসকদলের কাটমানি ও তোলাবাজির সংস্কৃতির কারণে বাংলার মানুষ আজ দিশেহারা। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই ইস্তফা প্রমাণ করে দিল যে, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নেতারাও এখন দলের এই দেউলিয়া রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।


