২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির ঠিক আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন মোড় দেখা গেল। দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বহু বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মদনের এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।বুধবার বিধানসভায় গিয়ে মদন মিত্র জানান, তিনি দলের সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়, কালীঘাটের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কও শেষ হয়েছে বলে স্পষ্ট করে দেন তিনি। এরপর তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেন। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।সম্প্রতি দলীয় সংগঠনে পরিবর্তনের সময় মদন মিত্রকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পদও তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে স্পষ্ট হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র একটি শিবির বদল নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কেরও ইতি টানলেন তিনি।নতুন শিবিরে যোগ দেওয়ার পর মদন মিত্র নিজের পুরনো দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক মন্তব্য করেন। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, দলের অনেক নেতাকর্মী তদন্তকারী সংস্থার চেয়ে অভিষেককেই বেশি ভয় পেতেন। তাঁর দাবি, দলের ভিতরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে কে কখন দায়িত্ব হারাবেন বা বাদ পড়বেন, সেই আশঙ্কা অনেকের মধ্যেই ছিল।তবে একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তিনি এখনও নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেসেরই একজন কর্মী বলে মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, দল কোনও একজন ব্যক্তির নয়, লক্ষ লক্ষ কর্মীর। তাই সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের কাজের ধরনে পরিবর্তন না আনলে আগামী দিনে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সমাবেশ নিয়েও মন্তব্য করেন মদন মিত্র। আদালতের নির্দেশে সীমিত জায়গায় সভার অনুমতি পাওয়াকে তিনি কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে, ওই এলাকায় এমনিতেই প্রতিদিন বহু মানুষের ভিড় থাকে। তাই সেখানে জনসমাগম নিয়ে আলাদা করে কিছু প্রমাণ করার নেই। তবে এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নের মুখে তুলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।এদিকে মদন মিত্রর এই রাজনৈতিক অবস্থান বদল নিয়ে নানা জল্পনাও তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিষয়টি হঠাৎ করে হয়নি। এর আগে তিনি ঋতব্রত শিবিরের ঘনিষ্ঠ নেতা স্বর্ণকমল সাহার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। আবার একই সময়ে তাঁর স্ত্রী এবং দুই ছেলের নামে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির সমন পৌঁছায়। এই দুই ঘটনার সময়কাল এক হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তদন্তকারী সংস্থার চাপের কারণেই কি তিনি নতুন শিবিরে গেলেন?যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ মদন মিত্র। তিনি বলেন, স্বর্ণকমল সাহার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে। সেদিন তিনি ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় স্বর্ণকমল তাঁকে বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনও যোগ নেই বলেই দাবি করেন তিনি।বিধানসভায় নিজের উপস্থিতি নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন কামারহাটির বিধায়ক। তিনি জানান, বিধায়ক হিসেবে তাঁর কিছু আর্থিক পাওনা এখনও বাকি রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ সংক্রান্ত বিলও এখনও মেটেনি। সেই কারণেই তিনি বিধানসভায় এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন।অন্যদিকে, আসন্ন ২১ জুলাইয়ের সভায় তাঁকে কোথায় দেখা যাবে, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি মদন মিত্র। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সে বিষয়ে কিছু বলতে চান না।মদন মিত্রর নতুন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ঋতব্রত শিবিরের নেতা প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, মদন মিত্র একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নিয়ে অযথা অবাক হওয়ার কিছু নেই।সব মিলিয়ে, ২১ জুলাইয়ের আগে মদন মিত্রর এই শিবির পরিবর্তন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আগামী দিনে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখন দেখার অপেক্ষা।
Popular Categories


