কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-তে বিপুল বিনিয়োগের জেরে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ মাইক্রোসফটের। সংস্থার কর্মীদের একটি বড় অংশকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাটি। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬০ হাজার কর্মী আসতে পারেন বলে দাবি এক সূত্রের। মূলত এআই পরিকাঠামো তৈরিতে বিপুল ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া এবং মূলধনের ব্যবহার আরও কার্যকর করতেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানা যাচ্ছে।
সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা, কানাডা, ভারত এবং ব্রিটেনের নির্দিষ্ট কিছু কর্মীর জন্য এই ‘ভলান্টারি এক্সিট অফার’ বা স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব ঘোষণা করেছে মাইক্রোসফট। অভিজ্ঞতার স্তর ৭০ বা তার নীচে থাকা কর্মীরা এই সুযোগ পেতে পারেন। সংস্থার মোট ২ লক্ষ ২৩ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৬০ হাজার কর্মী এই প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি। তবে এই সংখ্যা সম্ভাব্য যোগ্য কর্মীদের, কত জন শেষ পর্যন্ত চাকরি ছাড়বেন তা নয়।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড পরিকাঠামোয় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে মাইক্রোসফট। ওপেনএআই (OpenAI), অ্যানথ্রোপিক (Anthropic)-সহ বিভিন্ন সংস্থাকে ক্লাউড পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের এআই পরিষেবার পরিসরও বাড়াচ্ছে তারা।
সংস্থার পূর্ববর্তী আর্থিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মূলধনী ব্যয় ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত বছরের একই সময়ে মূলধনী ব্যয় ও ফিন্যান্স লিজের সম্মিলিত পরিমাণ ছিল ৩৪.৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এআই পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য সংস্থার ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে খরচের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়ানো মাইক্রোসফটের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাবের সঙ্গে এআই বিনিয়োগের ব্যয়ের সম্পর্ক সংস্থা কীভাবে ব্যাখ্যা করছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
চলতি বছরেই কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল মাইক্রোসফট। সেই কর্মসূচিতে আমেরিকার নির্দিষ্ট কর্মীদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে সংস্থার তরফে জানানো হয়, যোগ্য কর্মীদের ৩০ শতাংশেরও বেশি ওই প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়াও জুলাই মাসে প্রায় ৪,৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল সংস্থাটি। নতুন কর্মসূচিটি আগের উদ্যোগের তুলনায় আরও বিস্তৃত বলে জানা যাচ্ছে। এ বার ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যায় পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু কর্মী এই প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন। তবে কত জন কর্মীকে শেষ পর্যন্ত এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিদায় জানানো হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়নি বলে সূত্রের দাবি।
মাইক্রোসফটের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা চিফ পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ সংস্থার পরিবর্তনশীল কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে কর্মীদের কেরিয়ারের পরবর্তী পর্যায় বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সংস্থার কাজের ধরনে আরও নমনীয়তা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেলেও পরিবর্তন আনছে মাইক্রোসফট। গ্রাহকদের প্রকৃত এআই ব্যবহার এবং পরিষেবার চাহিদার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে প্রোগ্রামার, বিক্রয়কর্মী এবং সাপ্লাই চেইনের কর্মীদের কাজে এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে।
তবে এআই পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাইক্রোসফটের ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ছিল ১৯.৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ কম। একই সময়ে ক্লাউড ব্যবসার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনও নগদ প্রবাহের ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়ে কর্মীদের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে বলে সূত্রের দাবি। যাঁরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন, তাঁদের ৩১ ডিসেম্বর চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার কথা। ফলে একদিকে এআই-নির্ভর প্রযুক্তির প্রসার, অন্যদিকে কর্মী ও পরিচালন ব্যয়ের ভারসাম্য—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই এখন মাইক্রোসফটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।


