পশ্চিমবঙ্গের নয়টি মেডিকেল কলেজে মুসলিম চিকিৎসকদের উপস্থিতি মাত্র ৬.৬%—এই তথ্যটি সামনে এসেছে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে। এই সংখ্যাটি তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা ২৭.০১%। সেই সময় ক্ষমতায় ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার, যারা সমাজের সব শ্রেণির জন্য ন্যায় ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। কিন্তু বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে এই বৈষম্য কেবল বেড়েই চলেছে, যা রাজ্যের জনগণের জন্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র।
সাবার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এই তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মুসলিম চিকিৎসকদের শতাংশ সবচেয়ে বেশি, ১৯.৫৬%, যেখানে পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে এই সংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র ১.৮২%। এই নয়টি মেডিকেল কলেজে মোট ১,৩৮১ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ৯১ জন মুসলিম। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, রাজ্যের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব কতটা কম।
কলকাতার তিনটি নামকরা মেডিকেল কলেজের পরিসংখ্যানও এই বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে। ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে মুসলিম চিকিৎসকের শতাংশ ১০.৬৬%, নীল রতন সরকার মেডিকেল কলেজে ৫.৪৭%, আর কলকাতা মেডিকেল কলেজে মাত্র ২.৬৬%। এছাড়াও সাগর দত্ত মেডিকেল কলেজ, জলপাইগুড়ি সরকারি মেডিকেল কলেজ, রামপুরহাট সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজের তথ্যও এই গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সাবার ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সাবির আহমেদ এই তথ্যকে চোখ খুলে দেওয়ার মতো বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা সরকারি হাসপাতালে কর্মরত মুসলিম চিকিৎসকদের সংখ্যার চেয়ে চার গুণেরও বেশি।” এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছেন যে তপশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের চিকিৎসকদের সংখ্যাও তাদের জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। আটটি মেডিকেল কলেজে তপশিলি জাতির চিকিৎসক ১৩.৫১% এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের চিকিৎসক ৩.১৬%, যা স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত।
২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকারের শাসনকালে সামাজিক ন্যায় ও সমতার জন্য যে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল রাজ্যের উন্নয়নের একটি মূল স্তম্ভ। বামফ্রন্ট সরকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সমান সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নীতি প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর এই প্রচেষ্টা ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সরকারি চাকরিতে কম অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চললেও, তৃণমূল সরকার এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।
এই তথ্য সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। সাবির আহমেদ জানিয়েছেন, “২৩টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে মাত্র ৫০% আরটিআই-এর জবাব দিয়েছে। বাকিরা স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশের কথা বলে তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে।” বামফ্রন্টের আমলে আরটিআই আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বজায় রাখার যে চেষ্টা ছিল, তৃণমূলের শাসনে তা ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জনগণের টাকায় চলা মেডিকেল কলেজগুলোর ধর্মীয় ও জাতিগত প্রোফাইল গোপন রাখা একটি গোপনীয়তার সংস্কৃতি তৈরি করছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
এই পরিসংখ্যান থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট—মুসলিম চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। বামফ্রন্ট সরকার সমতার একটি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল, কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস তা ধরে রাখতে বা এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজ্যের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সব সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছ প্রশাসন ও সঠিক নীতির প্রয়োজন, যা বর্তমান সরকারের কাছ থেকে আশা করা কঠিন।


