Monday, March 9, 2026
32.4 C
Kolkata

ইউপিএসসি সাফল্যে নজর কাড়ল মুসলিম ছাত্রীদের উত্থান, সেরা ২৫-এ একাধিক নাম

ভারতের অন্যতম কঠিন এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী এই পরীক্ষায় অংশ নেন দেশের প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মুসলিম মহিলা পরীক্ষার্থীদের সাফল্য এখন নতুন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

এবারের ফলাফলেও দেখা গেছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন মহিলা প্রার্থী দেশের সেরা ২৫ জনের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। বিষয়টি অনেকের কাছেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এক সময় সমাজে এমন একটি ধারণা ছিল যে মুসলিম মেয়েদের জীবনের পরিধি ঘর এবং পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মেয়েরা সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।

জাকাত ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জফর মাহমুদ একবার বলেছিলেন, সময় বদলেছে এবং সমাজও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে যেখানে নারীদের ভূমিকা মূলত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সেখানে তাঁরা শিক্ষা, প্রশাসন এবং বিভিন্ন পেশায় নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছেন। তাঁর মতে, একজন নারী যখন প্রশাসনিক দায়িত্বে আসেন, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউপিএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখলে বোঝা যায় যে আইএএস, আইপিএসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও মুসলিম নারীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এদের অনেকেই সাধারণ বা সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের পরিবার থেকে উঠে এসেছেন।

মহারাষ্ট্রের যবতমালের বাসিন্দা আদিবা আনমের জীবনকাহিনি সেই সংগ্রামের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর বাবা ভাড়া করা অটো-রিকশা চালিয়ে পরিবারের খরচ চালাতেন। ছোট একটি ভাড়া বাড়িতে বড় হয়েছেন আদিবা। প্রথমদিকে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পরে তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। পরপর তিনবার ব্যর্থ হলেও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ফলাফলে ১৪২তম স্থান অর্জন করে তিনি নিজের লক্ষ্য পূরণ করেন।

বারাণসীর আরফা উসমানির গল্পও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়। তাঁর বাবা একটি ছোট দোকানে কাজ করেন। আরফা পড়াশোনায় সবসময়ই মেধাবী ছিলেন। আইআইটি (বিএইচইউ) থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর সামনে ভালো চাকরির সুযোগ ছিল। তবুও তিনি সমাজের জন্য কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে সিভিল সার্ভিসের পথ বেছে নেন। বড় কোচিং প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়াই নিজের প্রস্তুতিতে চতুর্থ প্রচেষ্টায় তিনি ১১১তম স্থান অর্জন করেন।

কলকাতার মোমিনপুর এলাকার সাইমা খানের গল্পও একইভাবে অনুপ্রেরণামূলক। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তিনি দীর্ঘদিন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। একাধিকবার ব্যর্থতার মুখ দেখলেও তিনি হতাশ হননি। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় ১৬৫তম স্থান অর্জন করে তিনি সফল হন।
এছাড়া সাম্প্রতিক ফলাফলে ইফরা শামস আনসারি ২৪তম, নওশীন নবম এবং বরদাহ খান অষ্টাদশ স্থান অর্জন করে সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। একইভাবে আবির আসদও কোনও কোচিং ছাড়াই নিজস্ব প্রস্তুতির মাধ্যমে ৩৫তম স্থান অর্জন করেছেন।

ইউপিএসসি পরীক্ষায় মুসলিম নারীদের ক্রমবর্ধমান সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমাজে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ২০২৫ সালের ফলাফলে প্রায় ৫৩ জন মুসলিম প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন, যার মধ্যে ১৩ জনের বেশি নারী। এই প্রবণতা আগামী দিনে আরও অনেক মেয়েকে উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিষেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

Hot this week

তেহেরানের তেল শোধনাগারে হামলা চালানোয়, ইসরায়েলকে যোগ্য জবাব দিল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা সংঘাতের নবম দিনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত...

জেনেনিন, কেনো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রমযানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করার পরামর্শ দিলেন?

রমযান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র একটি সময়। এই...

ভোটের আগে বিকশিত ভারতের প্রচারে আত্মমগ্ন সরকার, যুবকদের মিলছে না কর্মসংস্থান

দেশ জুড়ে ভোটের আবহ তৈরি হলেই নানা ধরনের বিজ্ঞাপন...

Topics

তেহেরানের তেল শোধনাগারে হামলা চালানোয়, ইসরায়েলকে যোগ্য জবাব দিল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা সংঘাতের নবম দিনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত...

রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের বাড়তি দাম বাতিলের দাবি তুলল সিপিআই(এম)!

রান্নার গ্যাসের দাম হঠাৎ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে...

Related Articles

Popular Categories