সাম্প্রতিক কালে প্রতিকুর রহমান এক পডকাস্ট-এ
CPI(M)- এর সাধারন সম্পাদক মহম্মদ সেলিম কে উদ্দেশ্য করে বলেন —
“বাংলাদেশের নির্বাচন হলো, জামাত হারল, সেই জামাতের পলিটিক্যাল উইংস ‘ওয়েলফেয়ার পার্টি’ আলিমুদ্দিনে ছবি তুলছে, ছবির পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কে? এসডিপিআই, পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া, যে ব্যান হয়ে গেছে রাষ্ট্রদোষের অপরাধে, এসআইও(SIO) যে ভারতবর্ষ থেকে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ করার জন্য, ইসলামিক টেররিস্ট অর্গানাইজেশন বলে যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”
প্রথমত, Students Islamic Organisation of India (SIO) ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ছাত্র সংগঠন, যা শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং ছাত্র-অধিকার নিয়ে কাজ করে। সংগঠনটি আইনত নিষিদ্ধ নয় এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকায় এর নাম নেই। তাই এটিকে ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
দ্বিতীয়ত, Social Democratic Party of India (SDPI) একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যা ভারতের নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ করা কোনো অপরাধ নয়।
এছাড়া Welfare Party of India একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা করে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের একই মঞ্চে দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এছারাও তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট দলের অন্যতম জন্মদাতা মুযাফফর আহমেদ এর নাম বিকৃত ভাবে মুযাফফর আহমেদ খান বলে আখ্যায়িত করেন।
প্রতিকুর রহমান দীর্ঘ সাত বছর Students’ Federation of India-এর রাজ্য নেতৃত্বে ছিলেন। সমালোচকদের প্রশ্ন—
সেই সময় কি তিনি এই অভিযোগগুলির কোনো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন? নাকি রাজনৈতিক অবস্থান বদলের পর তাঁর মূল্যায়নও বদলে গেছে?
নাকি তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর দল থেকে এই রকম নির্দেশ?
সমালোচকরা বলছেন, যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তা প্রমাণসহ তুলে ধরা উচিত। কিন্তু সাধারণীকরণ বা অপ্রমাণিত দাবি গণতান্ত্রিক আলোচনাকে দুর্বল করে। বিশেষ করে যখন একটি সংগঠন আইনি ভাবে নিষিদ্ধ নয়, তখন তাকে রাষ্ট্রবিরোধী বা সন্ত্রাসবাদী বলে আখ্যা দেওয়া দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভাষ্য নয়।
মুসলিম সমাজের বহু সংগঠন শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কাজ করে আসছে। তাদের কার্যক্রমের সমালোচনা করা যেতে পারে—কিন্তু সেটি হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর রাজনীতির কথা বলে আসছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—
প্রতিকুরের বক্তব্য কি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মত?
নাকি তা বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ?
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কি এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেবে?
এর আগে প্রতিকুর কে এরকম মন্তব্য করতে দেখা যায়নি, তবে তৃণমূল এ যোগ দেওয়ার পরই এই রকম মন্তব্য!
এর বিরুধ্যে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি কি কোনো পদক্ষেপ নেবেন?
প্রতিকুর কয়েক মাস আগেও তৃণমূলের বিভিন্ন নীতির সমালোচনায় সরব ছিলেন। আজ তিনি সেই দলের অংশ হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষ্য দিচ্ছেন—এতে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা শোনা যাচ্ছে। কেউ একে মতাদর্শগত পরিবর্তন বলছেন, কেউ দেখছেন কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কারও সঙ্গে ছবি তোলা বা একই মঞ্চে থাকার ঘটনাকে ‘জঙ্গি যোগ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা যুক্তিযুক্ত—সেই প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে, আদর্শগত পার্থক্য থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্য যদি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় বা সম্প্রদায়কে ঘিরে সন্দেহ তৈরির পথে যায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক নয়—সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।


