ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডিউটি কেনাবেচার অভিযোগের ঘটনায় রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কাছে রিপোর্ট চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে ফের প্রশ্ন তুললেন তিনি। তবে চোরবাগান পুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই রাজ্য সরকার ও জুনিয়র চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে এই রিপোর্ট তলবের যোগ রয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
গত ১৭ অক্টোবর চোরবাগানের ঘটনায় আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। ওই দিন রাতেই জুনিয়র চিকিৎসকেরা সাংবাদিক বৈঠক করে প্রশ্ন তোলেন, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকার কথা। তা হলে আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হল কেন? পরে মুখ্যমন্ত্রীও জানতে চান, দায়িত্বে থাকার সময় জুনিয়র চিকিৎসকেরা কী ভাবে সাংবাদিক বৈঠক করলেন। বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশও দেন তিনি।
এর মধ্যেই গত শুক্রবার ইন্টার্নদের ডিউটি কেনাবেচার অভিযোগ সামনে আসে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠকে জানান, কলকাতা-সহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে এই ধরনের ব্যবস্থা চলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি, ডিউটি ভাগাভাগির জন্য কলেজভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহারের কথাও উঠে আসে। মন্ত্রীর দাবি, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শনের সময় তিনি এক ডেন্টাল কলেজের ইন্টার্নকে সেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছিলেন। প্রায় চার বছর ধরে এই ব্যবস্থা চলছিল বলেও তাঁর বক্তব্য। আগামী নভেম্বর থেকে জুনিয়র চিকিৎসকদের বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, ইন্টার্নদের ডিউটি কেনাবেচার অভিযোগেও রিপোর্ট চাওয়া হবে। পাশাপাশি জুনিয়র চিকিৎসকদের একাংশের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাঁদের অযথা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত করতে সময় লাগবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজকে ফের সেরা করে তোলার জন্য সময় চেয়ে তিনি জানান, ছ’মাসের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, চোরবাগান কাণ্ডে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর যে দুর্বলতা সামনে এসেছে, তা থেকে নজর ঘোরাতেই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে একের পর এক রিপোর্ট তলব করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, বেসরকারি হাসপাতালে আহতদের পাঠানোর প্রয়োজন কেন হয়েছিল, সরকারকে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
চিকিৎসক নেতা অনিকেত মাহাতো বলেন, ইন্টার্নদের ডিউটি কেনাবেচা কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে সরকারি হাসপাতালের রোগীদেরও যখন বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে, তখন সেই সিদ্ধান্তের কারণও স্পষ্ট করা দরকার।
অন্যদিকে, চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী ও পরিচয় পাণ্ডার বক্তব্য, অভিযোগের তদন্ত হোক, কিন্তু তার নামে চিকিৎসকদের রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা করা চলবে না। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকীও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অভিযোগ সত্যি হলে শুধু ইন্টার্ন নয়, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান, কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভূমিকারও তদন্ত হওয়া উচিত।
জুনিয়র চিকিৎসকদের নেতা দেবাশিস হালদারের বক্তব্য, বেআইনি কাজের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে গোটা জুনিয়র চিকিৎসক মহলকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ডিউটি কেনাবেচার অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি চোরবাগান কাণ্ডে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।


