আগামী ১৬ মার্চ রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস যে চার প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, তা সামনে আসতেই রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। সদ্য প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার, মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক এবং আইনজীবী মানেকা গুরুস্বামী— এই চার মুখ নিয়েই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা ঘিরে রয়েছে বাবুল সুপ্রিয়কে। আসানসোলের অশান্তির সময়কার ঘটনাবলি ফের সামনে টানছেন বিরোধীরা। ইমাম রশীদীর ছেলেকে মসজিদ থেকে টেনে বের করে হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেই সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাবুলের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও প্রজ্বলিত করেছিল। যদিও তিনি আগেই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবু অতীতের সেই অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর রাজ্যসভা প্রার্থিতা ঘোষণার পর।
এ বার প্রার্থী তালিকায় মুসলিম মুখ না থাকায় সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সম্প্রতি পদ্মবিভূষণ–টিভূষণ সম্মানপ্রাপকদের তালিকাতেও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্যসভা প্রার্থী তালিকাতেও একই অভাব চোখে পড়ায় অসন্তোষের সুর শোনা যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীদের সামাজিক পটভূমি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের বক্তব্য, নামগুলি খতিয়ে দেখলে একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা স্পষ্ট হয়। কেউ উত্তরপ্রদেশের বনিয়া সম্প্রদায়ের, কেউ তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম— অর্থাৎ ভৌগোলিক বৈচিত্র্য থাকলেও অধিকাংশেরই অবস্থান উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজপরিসরের মধ্যে। সমালোচকদের প্রশ্ন, বাংলার জনসংখ্যার বহুত্বের সঙ্গে এই তালিকার সাযুজ্য কতটা? ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যের যে চিত্র রাজ্যের বাস্তবতায় দেখা যায়, সংসদের উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন কেন মিলল না— সেই প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
যদিও শাসকদলের বক্তব্য, প্রার্থী বাছাইয়ে ধর্ম বা জাতপাত কোনও মানদণ্ড নয়। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং জনজীবনে ভূমিকার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোয়েল মল্লিকের মনোনয়নকে সংস্কৃতি জগতের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। মানেকা গুরুস্বামীকে প্রার্থী করা হয়েছে মানবাধিকার ও সমকামীদের অধিকারের প্রশ্নে দলের অবস্থান স্পষ্ট করতেই— এমনটাই দাবি নেতৃত্বের।
রাজীব কুমারের নাম ঘোষণার পর তাঁর সাম্প্রতিক আইনি পদক্ষেপ নিয়েও শুরু হয়েছে আলাদা আলোচনা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার ঘটনাকে অনেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছেন।
সংখ্যার নিরিখে এই আসনগুলিতে শাসকদলের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু প্রার্থী বাছাইয়ের সামাজিক বার্তা, অতীতের বিতর্ক এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন— এই তিন দিক মিলিয়ে রাজ্যসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তাপমাত্রা যে আরও কিছুদিন উঁচুতেই থাকবে, তা স্পষ্ট।


